September 30, 2026, 6:14 pm

তুরস্কের পূর্বাঞ্চলীয় আগরি প্রদেশের দোগুবায়াজিত এলাকা। ছবি: সংগৃহীত

নূহের নৌকার সন্ধানে তুরস্কে ফের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান

তুরস্কের পূর্বাঞ্চলীয় আগরি প্রদেশের দোগুবায়াজিত এলাকায় ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘নূহের নৌকা’র সন্ধানে নতুন করে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। নৌকার আকৃতির ভূতাত্ত্বিক গঠন ‘দুরুপিনার ফরমেশন’কে ঘিরে চলমান গবেষণায় এবার ভূগর্ভস্থ কাঠামো শনাক্ত করতে রাডার স্ক্যান, মাটির নমুনা সংগ্রহ ও কোর ড্রিলিংয়ের মতো আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করছেন গবেষকেরা।

তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু ও দেশটির সংবাদমাধ্যম ডেইলি সাবাহর প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. জানকার আতিলার নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হচ্ছে। এতে মার্কিন গবেষক অ্যান্ড্রু জোন্সও যুক্ত রয়েছেন। পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত তিনটি তথ্যচিত্র নির্মাতা দলও অনুসন্ধানটি পর্যবেক্ষণ করছে। এর মধ্যে অভিযাত্রী ও টেলিভিশন উপস্থাপক বেয়ার গ্রিলসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি দলও রয়েছে।

গবেষকেরা প্রথমে দুরুপিনার ফরমেশনের বিভিন্ন পয়েন্টের জিপিএস অবস্থান নির্ধারণ করেন। পরে ওই এলাকার দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক মানচিত্র এবং অরথোফটো ম্যাপ তৈরি করা হয়। এরপর ভূগর্ভস্থ কাঠামো শনাক্ত করতে বিশেষায়িত রাডার দিয়ে জরিপ চালানো হয়।

অধ্যাপক জানকার আতিলার দাবি, রাডার জরিপে ভূগর্ভে কয়েকটি ফাঁপা বা শূন্যস্থান শনাক্ত হয়েছে। এর কিছু করিডর বা কক্ষের মতো দেখতে। এসব স্থানে এখন ড্রিলিং ও মাটির নমুনা সংগ্রহের কাজ চলছে।

নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নোয়া’স আর্ক স্ক্যানস’ নামের অভিযানে একটি সম্ভাব্য করিডরের সন্ধান পাওয়া গেছে, যার দৈর্ঘ্য ২৫০ ফুটের বেশি হতে পারে। পরবর্তী ধাপে সরু কোর ড্রিলের মাধ্যমে সেখানে ‘গোফার’ নামের বিশেষ রোবট পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। রোবটটি উচ্চ রেজ্যুলেশনের ভিডিও ধারণের পাশাপাশি মাটির নমুনাও সংগ্রহ করতে পারবে।

তবে এসব ভূগর্ভস্থ কাঠামো যে নূহের নৌকার অংশ, তার কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। আনাদোলুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুরুপিনার ফরমেশনের মধ্যে নূহের নৌকার ধ্বংসাবশেষ থাকার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

মাটির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যেও পার্থক্য

গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মাটির রাসায়নিক বিশ্লেষণ। ফক্স নিউজের প্রতিবেদনে গবেষক অ্যান্ড্রু জোন্সের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, দুরুপিনার ফরমেশনের ভেতরের ও বাইরের মাটির মধ্যে জৈব পদার্থের পরিমাণ ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য পাওয়া গেছে।

জোন্সের দাবি, ফরমেশনের ভেতরের মাটিতে বাইরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি জৈব পদার্থ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ভেতরের মাটিতে পটাশিয়ামের পরিমাণ ৩৮ শতাংশ বেশি এবং পিএইচ মাত্রায় প্রায় আট গুণ পার্থক্য পাওয়া গেছে।

গবেষকদের ব্যাখ্যা, দীর্ঘ সময় কোনো বদ্ধ পরিবেশে জৈব পদার্থের ক্ষয় হলে মাটির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে এ ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তবে এসব ফলাফলকে নূহের নৌকার অস্তিত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নমুনা বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।

১৯৫৯ সালে শনাক্ত হয় দুরুপিনার ফরমেশন

দুরুপিনার ফরমেশনটি তুরস্কের দোগুবায়াজিত জেলার তেলচেক গ্রামের কাছে, আরারাত পর্বতের আশপাশে অবস্থিত। ১৯৫৯ সালে তুরস্কের সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও মানচিত্রবিদ ইলহান দুরুপিনার আকাশ থেকে তোলা ছবি বিশ্লেষণের সময় অস্বাভাবিক আকৃতির এই ভূতাত্ত্বিক গঠন শনাক্ত করেন।

এরপর থেকেই স্থানটি নূহের নৌকার সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে আলোচনায় আসে। বিভিন্ন সময়ে সেখানে জরিপ, খনন ও অন্যান্য অনুসন্ধান চালানো হলেও নূহের নৌকার অস্তিত্বের পক্ষে এখনো কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বিজ্ঞানীদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে দুরুপিনার ফরমেশনকে প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন। ১৯৯৬ সালের একটি গবেষণাপত্রেও এটিকে নূহের নৌকার অংশ নয়, বরং প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক গঠন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল।

আধুনিক ভূতাত্ত্বিকদের একটি অংশের মতে, চুনাপাথর ও আগ্নেয় কাদামাটির সমন্বয়ে গঠিত কাঠামোটি ক্ষয়প্রক্রিয়ার কারণে নৌকার মতো আকৃতি পেয়েছে।

এর আগে মার্কিন উদ্ধারকারী বিশেষজ্ঞ ডেভিড ফ্যাসোল্ডও গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডার ব্যবহার করে এলাকাটি পরীক্ষা করেছিলেন। একসময় তিনি এটিকে প্রাচীন জাহাজের জীবাশ্মীভূত অবশিষ্টাংশ বলে মনে করলেও পরে নূহের নৌকা-সংক্রান্ত ওই তত্ত্ব থেকে সরে আসেন।

ফরমেশনটির আশপাশে পাওয়া কয়েকটি বড় পাথর নিয়েও নূহের নৌকার তত্ত্বের সমর্থকেরা দাবি করেছেন, এগুলো প্রাচীন জাহাজের নোঙর হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। তবে সংশয়বাদীদের মতে, এগুলো স্মৃতিচিহ্ন বা সমাধিফলক হতে পারে।

২০১৯ সালের ত্রিমাত্রিক গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডার স্ক্যানেও মাটির ঢিবিটির নিচে অস্বাভাবিক কাঠামোর ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল বলে ফক্স নিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান গবেষকেরা আগের এসব তথ্যও বিশ্লেষণ করছেন।

আরও দুই বছর চলতে পারে গবেষণা

গবেষকেরা জানিয়েছেন, বর্তমানে সংগৃহীত মাটির নমুনাগুলো শীতকালজুড়ে পরীক্ষা করা হবে। কয়েক মাসের মধ্যে পরীক্ষার ফল পাওয়া যেতে পারে। এরপর গবেষণার ফলাফল নিয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

শীতকালে পাহাড়ি এলাকায় গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। ফলে অনুসন্ধানের একটি অংশ আগামী বছর পর্যন্ত গড়াতে পারে। গবেষণা দলটি আগামী বছর এবং তার পরের বছরও অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে।

ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিম, তিন ধর্মের বিশ্বাসেই নূহের নৌকা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দুরুপিনার ফরমেশন সত্যিই নূহের নৌকার ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হলে স্থানটি আন্তর্জাতিকভাবে ধর্মীয় ও পর্যটন আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

তবে গবেষকেরা এখনো কোনো চূড়ান্ত দাবি করছেন না। ‘নোয়া’স আর্ক স্ক্যানস’-এর সঙ্গে যুক্ত লরেন উইটজকে জানিয়েছেন, তাদের মূল লক্ষ্য হলো বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা, দুরুপিনার ফরমেশনটি নূহের নৌকার ধ্বংসাবশেষ কি না।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা