September 17, 2026, 8:43 am

মাদ্রাসাছাত্র-আলেমদের কাছ থেকে ভাড়া নেন না ইয়ার মাহমুদ, চান শুধু দোয়া

নিজস্ব প্রতিনিধি:

টাঙ্গাইলের সখীপুরের সড়কে প্রতিদিন অটোভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন ইয়ার মাহমুদ। সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি বিদেশ যাওয়ার সময় নেওয়া ঋণও পরিশোধ করছেন তিনি। তবে তার অটোভ্যানে উঠলে একটি বিশেষ শ্রেণির যাত্রীকে কোনো ভাড়া দিতে হয় না।

মাদ্রাসাছাত্র, আলেম, হাফেজ, মুফতি, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের কাছ থেকে ভাড়া নেন না ৪১ বছর বয়সী ইয়ার মাহমুদ। এসব মানুষকে তিনি ভালোবেসে ‘কোরআনের পাখি’ বলে অভিহিত করেন। তাদের কাছ থেকে ভাড়ার পরিবর্তে চান শুধু দোয়া।

সম্প্রতি ইয়ার মাহমুদের অটোভ্যানে এমন একটি দৃশ্য দেখা যায়। গন্তব্যে পৌঁছে এক মাদ্রাসাছাত্র ভাড়া দিতে চাইলে টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। শিশুটির মাথায় স্নেহভরে হাত রেখে বলেন, ‘আমাকে দোয়া করবেন।’

সখীপুর উপজেলার কালিয়াপাড়া-ঘোনারচালা এলাকার হাসান আলীর ছেলে ইয়ার মাহমুদের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত জীবনের এক গভীর বেদনা।

সন্তান হারানোর পর নিয়ত

২০১১ সালে ইয়ার মাহমুদের ঘরে একটি পুত্রসন্তান জন্ম নেয়। জন্মের কয়েক ঘণ্টা পরই শিশুটির মৃত্যু হয়। সেই শোকের সময় তিনি সৃষ্টিকর্তার কাছে নিয়ত করেন, ভবিষ্যতে আরেকটি পুত্রসন্তান পেলে তাকে কোরআনের হাফেজ বানাবেন। একই সঙ্গে মাদ্রাসাছাত্র ও কোরআনের সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষদের সম্মান করার সিদ্ধান্ত নেন।

পরবর্তীতে তার একটি ছেলে জন্ম নেয়। বর্তমানে ছেলে মো. ইমন মিয়া স্থানীয় একটি দাখিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে।

ইয়ার মাহমুদ বলেন, ‘আমার নবজাতক পুত্রসন্তান যখন মারা যায়, তখনই নিয়ত করেছি—আমি আজীবন মাদ্রাসাছাত্র, আলেম ও হাফেজদের সম্মান করব। সেই ভালোবাসা থেকেই ২০১৫ সাল থেকে অটোভ্যানে মাদ্রাসাছাত্র, আলেম, হাফেজ ও মুফতিদের ভাড়া নিই না।’

বিদেশে গিয়েও থামেনি সংগ্রাম

জীবিকার আশায় ২০১৪ সালে ধারদেনা করে ইউরোপের গ্রিসে যান ইয়ার মাহমুদ। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় সেখানে মাত্র ১১ মাস অবস্থান করে দেশে ফিরতে হয় তাকে। বিদেশ যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণের একটি বড় অংশ এখনো পরিশোধ করতে পারেননি তিনি।

দেশে ফিরে ২০১৫ সালে একটি অটোভ্যান কিনে চালানো শুরু করেন। সেই সময় থেকেই নিজের নিয়ত অনুযায়ী মাদ্রাসাছাত্র, আলেম, হাফেজ, মুফতি, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের বিনা ভাড়ায় যাতায়াতের সুযোগ করে দিচ্ছেন।

তার অটোভ্যানের পেছনেও এ বিষয়ে লেখা রয়েছে।

ইয়ার মাহমুদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জন মাদ্রাসাছাত্র, ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ কোরআনের সঙ্গে সম্পৃক্ত যাত্রী তার অটোভ্যানে বিনা ভাড়ায় যাতায়াত করেন।

‘আমি তাদের কাছ থেকে দোয়া চাই’

সংসারে অভাব থাকলেও মাদ্রাসাছাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া না নেওয়াকে আয়ের ক্ষতি হিসেবে দেখেন না ইয়ার মাহমুদ। বিদেশ যাওয়ার সময় নেওয়া প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ এখনো তার ওপর রয়েছে। অটোভ্যান চালিয়েই সেই ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করছেন তিনি।

ইয়ার মাহমুদ বলেন, ‘আল্লাহ আমাকে দিচ্ছেন। এমনিতেই যদি ৫০০-৬০০ টাকা কামাই করি, মাদ্রাসাছাত্রদের কাছ থেকে ভাড়া না নিলে মনে হয় ওই দিন আরও বেশি হয়।’

তিনি বলেন, ‘আমি মাদ্রাসার ছাত্র, কোরআনের পাখিদের কাছ থেকে কোনো ভাড়া চাই না, আমি তাদের কাছ থেকে দোয়া চাই। মানুষের দোয়া থাকলে জীবনে সফলভাবে কোনো ভালো কাজ করা সম্ভব। এটা লোক দেখানো কোনো কাজ নয়। নিজের ইচ্ছায়, আল্লাহকে খুশি করার জন্য এবং কোরআনের পাখিদের সম্মান করার জন্য আমি এটি করছি।’

স্থানীয়দের প্রশংসা

ইয়ার মাহমুদের অটোভ্যানে নিয়মিত যাতায়াত করেন স্থানীয় ইমাম ও একটি মাদ্রাসার পরিচালক হাফেজ আইন উদ্দিন আল আজাদ। তিনি বলেন, ‘ইয়ার মাহমুদ ভাই খুব সুন্দর মনের মানুষ। এমন মহৎ কাজ করে তিনি কোরআনের পাখিদের সম্মানিত করেছেন।’

যাত্রী মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘আজকাল এমন মানুষ দেখাই যায় না। অনেকেই ১০ টাকার ভাড়া ২০ টাকা নিয়ে থাকেন। কিন্তু তিনি কোরআনের পাখিদের, অর্থাৎ মাদ্রাসাছাত্রদের কাছ থেকে ভাড়া নেন না। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।’

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য শামসুল আলম বলেন, ইয়ার মাহমুদ অত্যন্ত পরিশ্রমী মানুষ। নিজের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও কোরআনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষদের বিনা ভাড়ায় গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া তার মানবিকতার পরিচয়।

ছেলের এমন উদ্যোগে আনন্দ প্রকাশ করেন ইয়ার মাহমুদের বাবা হাসান আলীও।

ইয়ার মাহমুদের জীবনের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব খুবই সরল। অটোভ্যান চালিয়ে সংসার চালানো, ধীরে ধীরে ঋণ পরিশোধ করা এবং সামর্থ্য থাকা পর্যন্ত মাদ্রাসাছাত্র ও কোরআনের সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষদের সম্মান করে যাওয়া।

নিজের অটোভ্যানটির দিকে তাকিয়ে ইয়ার মাহমুদ বলেন, ‘মরার আগ পর্যন্ত আমি এই পেশায় থাকতে চাই এবং মাদ্রাসাছাত্র, কোরআনের পাখিদের এই সম্মান জানাতে চাই। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই।’

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা