সচিবালয়ে বদলি, পদায়ন ও উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক নিয়োগে তদবির এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও ঘনিষ্ঠ সহকারীদের ঘিরে গড়ে ওঠা অনানুষ্ঠানিক প্রভাববলয় নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অভিযোগ রয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিষ্পত্তি থেকে শুরু করে বদলি-বাণিজ্য ও নিয়োগে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাও করছেন কেউ কেউ।
সম্প্রতি একটি মন্ত্রণালয়ের অধীন ১১টি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক একযোগে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হলে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে একটি জুম মিটিংয়ের মাধ্যমে নতুন প্রকল্প পরিচালকদের নাম প্রস্তাব করা হয়। বর্তমান পরিচালকদের কর্মদক্ষতা, প্রকল্পের অগ্রগতি কিংবা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বিষয়টি জানতে পেরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী প্রস্তাবটি আটকে দেন।
পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ক্ষমতাসীন দলের একটি অঙ্গসংগঠনের এক শীর্ষ নেতাসহ দুই ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবকে পছন্দের কর্মকর্তাদের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিতে একটি তালিকা দিয়ে চাপ সৃষ্টি করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্রের দাবি, পছন্দের কর্মকর্তাদের পদায়নের জন্য কোটি কোটি টাকার গোপন লেনদেনের চুক্তি হয়েছিল। কয়েকজন কর্মকর্তার কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের জন্য চাপ দেওয়া ব্যক্তিরা প্রায় প্রতিদিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত সচিবের একান্ত সচিবের (পিএস) কক্ষে অবস্থান করেন। সচিব বা মন্ত্রীর দপ্তরে কোন ফাইল যাচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করেন তারা। পছন্দ না হলে কোনো কোনো ফাইলের কার্যক্রম আটকে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত পদায়ন ও বদলি নিয়ে তদবিরের ঘটনাও ঘটছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা জানান, এসব কর্মকাণ্ডে তারা অসন্তুষ্ট হলেও প্রকাশ্যে কিছু বলতে সাহস পান না। তাদের আশঙ্কা, প্রতিবাদ করলে চাকরি নিয়ে ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সচিবও পরিস্থিতি নিয়ে বিরক্ত ও বিব্রত বলে সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে না জানিয়ে সরকারি সফরসূচি তৈরি করে একটি উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় ও খাদ্যগুদাম পরিদর্শনে যান তার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও)। গত সপ্তাহের এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে মন্ত্রী প্রথমে মৌখিকভাবে এপিএসকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন। এক সপ্তাহ পর ব্যক্তিগত কর্মকর্তাকেও সরানো হয়। ওই সফরে কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাও অংশ নিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, আরেকটি বড় মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রীর পিএস ও এপিএসকেও সম্প্রতি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ওই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদবির ও বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছিল বলে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দাবি করেন।
পুরোনো সংস্কৃতি বদলানোর চ্যালেঞ্জ
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসনে পরিবর্তন ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা তৈরি হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও প্রশাসনিক কাজে অনানুষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তার ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। বর্তমানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলেও সচিবালয়ে তদবির, বদলি-বাণিজ্য ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠায় প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন সুপারিশ, ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে প্রতিদিন বহু মানুষ সচিবালয়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে যাতায়াত করেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন ভবনের করিডর, মন্ত্রীর দপ্তরের সামনে এবং কর্মকর্তাদের কক্ষের আশপাশে তাদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি, নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে সুবিধা দেওয়া এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। এতে স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং কর্মকর্তাদের ওপর অনানুষ্ঠানিক চাপ তৈরি হয়।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের অভিযোগ, ফাইল ছাড়, বদলি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্মতি ছাড়া অনেক সময় কাজ এগোয় না। তবে বিতর্ক এড়াতে ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তি বজায় রাখতে কয়েকজন মন্ত্রী পিএস ও এপিএস নিয়োগ না দিয়ে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করছেন বলে জানা গেছে।
প্রভাববলয় ভাঙার তাগিদ
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক নিয়োগপ্রক্রিয়ায় জবাবদিহি, পিএস ও এপিএসদের ক্ষমতার সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ, সম্পদের হিসাব প্রকাশ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ডিজিটাল নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।
সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, বর্তমান সময়ে প্রশাসনিক কাজে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং নিয়োগ ও বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠা দুর্ভাগ্যজনক। বাংলাদেশে প্রতিটি সরকারের আমলেই ক্ষমতার কেন্দ্র ঘিরে একটি অনানুষ্ঠানিক প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে, যারা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রশাসনকে সুশৃঙ্খল রাখতে চাইলে এ ধরনের কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে দমন করতে হবে। প্রশাসনের ভেতরে অনানুষ্ঠানিক প্রভাববলয় গড়ে ওঠার সুযোগ থাকলে গণঅভ্যুত্থান, রাজনৈতিক পরিবর্তন কিংবা নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।