বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। গত আগস্ট শেষে ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪১ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। গত জুনে প্রথমবারের মতো এ পরিমাণ ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়ায়। বিনিয়োগের সুযোগ কম থাকায় উদ্বৃত্ত অর্থের বড় অংশ ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকারকে ঋণ দিতে ব্যবহার করছে ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল ৪ লাখ ২৩ হাজার ৯৫ কোটি টাকা। জুনে ছিল ৪ লাখ ১৪ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এ পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। একই বছরের জুনে ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুন শেষে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল ১ লাখ ৯৩ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা।
উদ্বৃত্ত তারল্য বলতে আমানতের বিপরীতে বিধিবদ্ধ তারল্য সংরক্ষণের পর ব্যাংকের হাতে থাকা অর্থকে বোঝায়। বর্তমানে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোকে মোট আমানতের ১৩ শতাংশ এবং শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোকে ৪ শতাংশ বিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (এসএলআর) সংরক্ষণ করতে হয়। এ ছাড়া উভয় ধরনের ব্যাংককে নগদ জমা অনুপাত (সিআরআর) হিসেবে আরও ৪ শতাংশ অর্থ রাখতে হয়। ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের বিপরীতে এসএলআর সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে।
ব্যাংকাররা জানান, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ হচ্ছে না। অন্যদিকে, খেলাপি ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাপ থাকায় ভালো ব্যাংকগুলোও ঋণ বিতরণে সতর্কতা অবলম্বন করছে। ফলে বেসরকারি খাতে বার্ষিক ঋণপ্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমেছে, যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কম। এ পরিস্থিতিতে ঝুঁকি কম বিবেচনায় ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে ব্যাংকগুলো। এতে দীর্ঘদিন দুই অঙ্কে থাকা এসব সরকারি সিকিউরিটিজের সুদহারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
ব্যাংকারদের মতে, কয়েকটি ব্যাংক দীর্ঘদিন আমানত ফেরত দিতে না পারায় মানুষের মধ্যে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ রাখার প্রবণতা বেড়েছিল। এখন সেই অর্থ আবার ব্যাংকে ফিরছে। তবে আমানতের বড় অংশ যাচ্ছে হাতেগোনা কয়েকটি ব্যাংকে। এসব ব্যাংক তুলনামূলক কম সুদ দিলেও সময়মতো টাকা ফেরত পাওয়ার প্রত্যাশায় গ্রাহকেরা সেখানে অর্থ জমা রাখছেন।
এদিকে, গ্রাহকের স্বার্থ বিবেচনায় ঋণ ও আমানতের সুদহারের সর্বোচ্চ ব্যবধান বা স্প্রেড ৪ শতাংশ নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে অনেক ব্যাংক এ নির্দেশনা পুরোপুরি অনুসরণ করছে না। প্রচলিত হিসাব পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার বিষয়ে তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করছে বলে জানা গেছে।
প্রণোদনা ঋণ বিতরণেও ধীরগতি
ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত অর্থ বাড়লেও কম সুদের ঋণ বিতরণে তেমন সাড়া মিলছে না। ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরাতে গত মে মাসে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত এ তহবিল থেকে ঋণ বিতরণ হয়েছে মাত্র ১১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা।
প্যাকেজের আওতায় বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য বরাদ্দ ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে বিতরণ হয়েছে মাত্র ৫৬১ কোটি টাকা। অন্যদিকে, গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, সবুজ কারখানায় রূপান্তর, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রপ্তানি এবং হিমায়িত চিংড়ি খাতের জন্য বরাদ্দ ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত কোনো অর্থ বিতরণ হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একদিকে ব্যাংকে উদ্বৃত্ত অর্থ বাড়ছে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ও প্রণোদনা তহবিলের ব্যবহার কম থাকছে। এতে বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং ব্যাংক খাতের অর্থ ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সমকাল থেকে: