October 16, 2026, 2:43 pm

দেশে খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ

দেশে খাদ্য কেনার সামর্থ্য হারাচ্ছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় ও কর্মসংস্থানের সংকটের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালের শেষ চার মাসে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে থাকতে পারে দেশের ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ। বছরের শুরুর তুলনায় এ সংখ্যা ২৮ লাখ বেশি।

আজ শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিশ্ব খাদ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামী দিনের পুষ্টি’। ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০তম সম্মেলনে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৮১ সালে প্রথমবারের মতো দিবসটি উদযাপন করা হয়। খাদ্যপ্রাপ্তি ও পুষ্টির গুরুত্ব তুলে ধরার এ দিনে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

ডব্লিউএফপির গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। পণ্যের উচ্চমূল্য ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি বন্যায় কৃষিজমির ক্ষতি, শিশুদের অপুষ্টি এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খাদ্যসহায়তা অব্যাহত রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।

খাদ্যের জোগান থাকলেও তা কেনার সামর্থ্য অনেক পরিবারের নেই। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, বর্তমানে বাজারে মোটা চালের কেজি অন্তত ৫০ টাকা। খোলা আটার দামও কেজিপ্রতি প্রায় ৫০ টাকা। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের মাসিক ব্যয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে খাবার কিনতে।

২০২৫ সালে বাংলাদেশে ‘তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায়’ ছিল দেড় কোটিরও বেশি মানুষ | কালের কণ্ঠ

খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা শুরু হয় ২০২২ সালের প্রথম দিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা প্রায় এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরবর্তী কয়েক মাসও এ হার ১০ শতাংশের ওপরে ছিল। বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার কমলেও পণ্যের দাম কমে আগের অবস্থায় ফেরেনি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সেপ্টেম্বরের হিসাবে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে। অর্থাৎ, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ব্যয়ের চাপ পুরোপুরি কমেনি।

অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ১৩ অক্টোবরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। প্রবৃদ্ধির ধীরগতি ও মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকলে মানুষের আয়, ক্রয়ক্ষমতা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

কৃষি উৎপাদনেও দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে। ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার কৃষক পরিবার এবং ১৩ লাখ মানুষ। কৃষিজমি নষ্ট হওয়ায় একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, অন্যদিকে কৃষির ওপর নির্ভরশীল বহু মানুষের আয়ের পথ সংকুচিত হয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে প্রবাসী আয়ের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এ অঞ্চলে অস্থিরতার কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে দেশের অর্থনীতি ও পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

খাদ্যের অভাবের পাশাপাশি পুষ্টিহীনতাও উদ্বেগজনক। ডব্লিউএফপির তথ্য অনুযায়ী, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি চার শিশুর একজন খর্বকায়। অর্থাৎ বয়সের তুলনায় তাদের উচ্চতা কম। এ ছাড়া ১১ শতাংশ শিশু ক্ষীণকায়, অর্থাৎ উচ্চতার তুলনায় তাদের ওজন কম। দেশের প্রতি পাঁচটি পরিবারের মধ্যে দুটিতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অণুপুষ্টির ঘাটতি রয়েছে। পর্যাপ্ত খাবার ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান না পাওয়ায় শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশে দেড় কোটির বেশি মানুষ খাদ্য সংকটে?

খাদ্য বিতরণে সরকারি কর্মসূচির তথ্যেও কিছুটা ঘাটতির চিত্র পাওয়া যায়। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ৮ লাখ ৩৪ হাজার টন চাল ও গম বিতরণ করা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ পরিমাণ ৪৮ হাজার টন কম। তবে দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ২৩ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা মোকাবিলায় সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, সংকট মোকাবিলায় সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে তাদের কাছে দ্রুত ও কার্যকর সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।

তিনি বলেন, নিম্ন আয়ের পরিবার, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, নারীপ্রধান পরিবার এবং দুর্যোগকবলিত এলাকার মানুষের জন্য খাদ্যসহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি ন্যায্যমূল্যে চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি এবং প্রকৃত অভাবগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তার পরিধি বাড়াতে হবে।

বাজারে কৃত্রিম সংকট ও পণ্যের দাম নিয়ে কারসাজি ঠেকানোর ওপরও গুরুত্ব দেন সেলিম রায়হান। তার মতে, মজুতদারি প্রতিরোধে নিয়মিত নজরদারি এবং খাদ্যপণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে খাদ্য সহায়তা যেন প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা