October 2, 2026, 6:08 am

ফের মার্কিন হামলার আশঙ্কা, আরও বড় জবাবের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান

যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালালে আগের চেয়ে আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। একই সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতাও চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান। তবে দেশটির একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

তিন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা ও আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছেন। এতে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট স্থাপনা নয়, মার্কিন সামরিক অভিযানকে সমর্থনকারী দেশগুলোর স্থাপনা এবং প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের কিছু লক্ষ্যবস্তুও অন্তর্ভুক্ত করার বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে।

গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিউইয়র্ক থেকে দেশে ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে কী ধরনের এবং কখন জবাব দেওয়া হবে, তা নিয়ে ইরানের সামরিক ও শীর্ষ রাজনৈতিক কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা জোরদার হয়েছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরানবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাবে, নাকি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার মতো সীমিত পদক্ষেপ নেবে, তা নিয়ে তেহরান এখনো নিশ্চিত নয়। তাঁর মতে, ইরান প্রতীকী হামলার জবাবে প্রতীকী জবাব দেওয়ার পরিবর্তে নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে।

ইরানি কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালালে লেবানন, ইয়েমেন ও ইরাকে থাকা ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য জবাব হরমুজ প্রণালি থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য এবং এর বাইরেও মার্কিন স্বার্থকে লক্ষ্য করে বিস্তৃত হতে পারে বলে তারা জানিয়েছেন।

তবে সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি আলোচনার পথও খোলা রাখছে তেহরান। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে অর্থনীতি কতটা চাপ সহ্য করতে পারবে, সেটি ইরানের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। দেশটির তেল রপ্তানিও মার্কিন অবরোধের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

গত সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় কাতারের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠায় তেহরান। এতে যুদ্ধ বন্ধ, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ থাকা অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড় এবং তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা শিথিল করার দাবি জানানো হয়। বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং সাত দিনের মধ্যে আঞ্চলিক শত্রুতা বন্ধের প্রস্তাব দেয় ইরান।

শনিবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তিনি ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, মঙ্গলবার কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের একটি জবাব তেহরানের কাছে পৌঁছেছে এবং সেটি পর্যালোচনা করছে ইরান।

ইরানি সূত্রগুলোর ভাষ্য, ওয়াশিংটন আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করতে চায়। তবে তেহরান বলছে, তাদের নির্ধারিত সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত পারমাণবিক আলোচনা শুরু হবে না।

ইরানের এক কর্মকর্তা বলেন, সরাসরি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান না করে পরোক্ষ আলোচনা চললেও দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচির পরিচালক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা এখনো সীমিত। তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের মার্কিন অবরোধ ইরানের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে এবং এতে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ

চলমান সংঘাতে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দুর্বল অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপরও চাপ পড়েছে এবং পেন্টাগনের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরান ও তার মিত্ররা হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিরাও সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার আশঙ্কা

যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বিগ্ন ইরানের নেতৃত্ব। সাবেক এক জ্যেষ্ঠ সংস্কারপন্থী কর্মকর্তার দাবি, অর্থনৈতিক সংকটের কারণে জানুয়ারিতে দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ হয়েছিল, তা আবারও দেখা দিতে পারে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, যুদ্ধের সময় ভিন্নমত দমনে ইরানি কর্তৃপক্ষের তৎপরতা আরও বেড়েছে। জানুয়ারির বিক্ষোভের বার্ষিকী সামনে রেখে কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ অবস্থায় একদিকে সম্ভাব্য নতুন মার্কিন হামলার জবাবের জন্য সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে তেহরান, অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ কমাতে কূটনৈতিক যোগাযোগও অব্যাহত রাখছে। তবে দুই পক্ষের অবস্থানের দূরত্বের কারণে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমঝোতা হওয়ার বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা