October 3, 2026, 7:55 am

খসড়া সাইবার আইন নিয়ে সাংবাদিকদের উদ্বেগ, বাড়তে পারে মতপ্রকাশের ঝুঁকি

প্রস্তাবিত ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর কয়েকটি ধারা নিয়ে সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, খসড়ার কিছু বিধান অনুসন্ধানী ও সমালোচনামূলক সাংবাদিকতার পরিসর সংকুচিত করতে পারে। একই সঙ্গে কনটেন্ট অপসারণ, ডিজিটাল মানহানি, গুজব ও ভুল তথ্যের মতো বিষয়ে বিস্তৃত ক্ষমতা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে বলেও মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

খসড়ার ৮(২) ধারায় জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, অখণ্ডতা, জনশৃঙ্খলা, উসকানি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে অনলাইন কনটেন্ট ব্লক বা অপসারণের ক্ষমতা রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের জন্য ‘মানহানিকর’ বা ‘অবমাননাকর’ তথ্যও বিধানের আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব বিধানের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের পরিসর স্পষ্ট না হলে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

খসড়ায় আইন প্রয়োগের সঙ্গে নতুন কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার প্রস্তাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে তথ্য মন্ত্রণালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা গণমাধ্যমের কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে এই আইনের ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাংবাদিকদের কেউ কেউ।

প্রস্তাবিত ২৫ ধারাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। বর্তমান আইনে অনলাইন যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, পর্নোগ্রাফি ও শিশু যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত অপরাধের বিষয় থাকলেও সংশোধিত খসড়ায় মানহানি, অপমান, হেয়প্রতিপন্ন করা ও বুলিংয়ের মতো বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। কোনো বক্তব্য, প্রকাশনা বা প্রতিবেদন কাউকে অসম্মানজনকভাবে উপস্থাপন করতে পারে—এমন বিষয়ও এর আওতায় পড়তে পারে।

এ ধারায় শাস্তির মাত্রাও বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। সাধারণ অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ কারাদণ্ড দুই বছর থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করার কথা বলা হয়েছে। ভুক্তভোগী নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী হলে শাস্তি আরও বাড়িয়ে ১০ বছর করার প্রস্তাব রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এসব বিধানের কারণে সাংবাদিকদের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ-সেন্সরশিপ বাড়তে পারে।

এ ছাড়া প্রস্তাবিত ২৬(এ) ধারায় সাইবার স্পেসে ‘গুজব’ ও ‘ভুল তথ্য’ প্রকাশ বা প্রচারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে। এর জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে ‘গুজব’ ও ‘ভুল তথ্যের’ সুস্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় আইনটির অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

খসড়ার ৩৩ ও ৩৪ ধারায় কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস ও সংরক্ষিত ডেটায় প্রবেশ, তল্লাশি ও জব্দের ক্ষমতার বিষয়টিও রয়েছে। সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এ ক্ষমতা প্রয়োগ হলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের গোপন সূত্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। কারণ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় অনেক সূত্র পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তথ্য দিয়ে থাকেন।

আরও উদ্বেগের বিষয় হিসেবে এসেছে ভ্রাম্যমাণ আদালতে বিচার করার প্রস্তাব। সাংবাদিকদের একাংশের মতে, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে এ ধরনের বিচার হলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের কাজের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

তবে সরকার বলছে, আইনটি যেন নিপীড়নমূলক না হয় এবং সাংবাদিক বা গণমাধ্যম যাতে এর শিকার না হয়, সে বিষয়ে সতর্কতা রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, গণমাধ্যমের সুরক্ষায় অংশীজনদের সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে খসড়া আইন প্রণয়ন করা হবে। সম্প্রতি সাংবাদিক, সম্পাদক ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে খসড়াটি পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তও হয়েছে।

খসড়াটি নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)ও উদ্বেগ জানিয়েছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, সাইবার অপরাধ, সাইবার সুরক্ষা ও জনগণের মতপ্রকাশের অধিকার—তিনটি ভিন্ন বিষয়কে একই আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তার ভাষ্য, এতে অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বর্তমানে খসড়াটি পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তাই সংশ্লিষ্টদের মতামত ও সুপারিশের ভিত্তিতে এর বিভিন্ন ধারায় আরও পরিবর্তন আসার সুযোগ রয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা