দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বেক্সিমকো ফার্মার পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন কোম্পানিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। সম্প্রতি এ বিষয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) জানিয়েছে বেক্সিমকো ফার্মা।
বিএসইসিকে দেওয়া কোম্পানিটির চিঠিতে বলা হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদ থেকে পদত্যাগে সম্মতি জানিয়েছেন সালমান এফ রহমান। তার পদত্যাগের পর কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ নতুন করে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত নতুন পর্ষদে বেক্সিমকো ফার্মার উদ্যোক্তাদের মধ্য থেকে তিনজন, চারজন স্বতন্ত্র পরিচালক, আইএফআইসি ব্যাংকের মনোনীত একজন পরিচালক এবং পদাধিকারবলে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, এভাবে পর্ষদ পুনর্গঠনের বিষয়ে বিএসইসির পক্ষ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে।
কোম্পানির পক্ষ থেকে বিএসইসিকে জানানো হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেক্সিমকো ফার্মা যে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে, তা বিবেচনায় নিয়েই সালমান এফ রহমান পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার কারণে কোম্পানির ব্যবসা ও শেয়ারধারীদের স্বার্থ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের আগস্টে সালমান এফ রহমান গ্রেপ্তার হন। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও সম্মতি
বেক্সিমকো ফার্মা দেশের শেয়ারবাজারের পাশাপাশি লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেটেও (এআইএম) তালিকাভুক্ত। ফলে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আনতে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের সংশ্লিষ্ট নিয়মও অনুসরণ করতে হবে।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসার স্বার্থে সালমান এফ রহমানকে পরিচালনা পর্ষদ থেকে বাদ দেওয়ার পরিকল্পনায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও সম্মতি দিয়েছেন।
বিএসইসি সূত্র জানায়, পর্ষদ পুনর্গঠনের সময় বিদেশি শেয়ারধারীদের একজন প্রতিনিধিকে পরিচালক করার প্রস্তাব দিয়েছিল কমিশন। তবে এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সম্মতি দেননি। এরপর স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা বাড়িয়ে পর্ষদ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
নতুন পরিচালক নিয়োগে সময় লাগবে ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ
লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তির কারণে নতুন পরিচালক নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করতে হবে। বেক্সিমকো ফার্মার পক্ষ থেকে বিএসইসিকে এ বিষয়টি জানানো হয়েছে।
লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার আগে তার বিষয়ে নির্ধারিত যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। এই প্রক্রিয়া শেষ করতে চার থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
পর্ষদ পরিবর্তনে ফিরতে পারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা
শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বেক্সিমকো ফার্মা দেশের ওষুধ খাতের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সালমান এফ রহমানের মালিকানা ও প্রভাবের কারণে কোম্পানিটির সুনাম ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তাদের ধারণা, সালমান এফ রহমানের পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ফলে কোম্পানিটির জন্য তুলনামূলক স্বাভাবিক ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিন মাসে মুনাফা ২২২ কোটি টাকা
বেক্সিমকো ফার্মার সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ প্রান্তিকে কোম্পানিটি ২২২ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা ছিল ৬৯৪ কোটি টাকা।
১৯৮৬ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বেক্সিমকো ফার্মার উদ্যোক্তাদের হাতে বর্তমানে কোম্পানিটির ৩০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। উদ্যোক্তাদের মধ্যে সালমান এফ রহমানও রয়েছেন। বাকি ৭০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক, বিদেশি ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে।