September 14, 2026, 7:23 pm

ছবি:সংগৃহীত

তিন মাসে কোটি টাকার বেশি আমানতের হিসাব বেড়েছে ৫ হাজার

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির বড় একটি অংশ যখন সংসার চালাতে সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হচ্ছে, তখন ব্যাংকিং খাতে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। ব্যাংকে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এতে দেশের অর্থনীতিতে আয় ও সম্পদ বৈষম্যের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টি। মার্চ শেষে এ ধরনের হিসাব ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি।

বাড়ছে সামগ্রিক আমানতও

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৬৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮৮টি। এসব হিসাবে মোট আমানতের পরিমাণ ২২ লাখ ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা।

এর আগে মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংকিং খাতে মোট আমানত বেড়েছে ৫২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা।

একদিকে মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে বাড়ছে বড় আমানত

অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকিং খাতের এই চিত্র দেশের অর্থনীতিতে বিদ্যমান বৈষম্যকে স্পষ্ট করছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামের চাপ সামলাতে অনেক পরিবারকে আগের সঞ্চয় ব্যবহার করতে হচ্ছে।

অন্যদিকে বড় ব্যবসায়ী, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং উচ্চ আয়ের মানুষের একটি অংশের ব্যাংক আমানত বাড়ছে। পাশাপাশি ব্যাংকের বাইরে থাকা কিছু অর্থও আস্থা ফিরে আসার কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় জমা পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব কারণ সামগ্রিক আমানত বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

কোটি টাকার হিসাব মানেই কোটিপতি নয়

তবে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা দিয়ে দেশে প্রকৃত কোটিপতির সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কারণ এই হিসাবের মধ্যে ব্যক্তি ছাড়াও বিভিন্ন কোম্পানি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার হিসাব রয়েছে।

এ ছাড়া একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একাধিক ব্যাংকে একাধিক হিসাব পরিচালনা করতে পারেন। ফলে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা এবং প্রকৃত কোটিপতির সংখ্যা এক নয়।

স্বাধীনতার পর ৫ থেকে এখন ১ লাখ ৪১ হাজার

স্বাধীনতার পর দেশের ব্যাংকিং খাতে কোটি টাকার আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা ছিল খুবই কম। ১৯৭২ সালে এ ধরনের হিসাব ছিল মাত্র ৫টি। ১৯৯০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪৩টিতে।

পরবর্তী সময়ে এই সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০০৮ সালে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা ছিল ১৯ হাজার ১৬৩টি। ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৩ হাজার ৮৯০টিতে।

এরপরও কোটি টাকার হিসাব বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত থাকে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে এ ধরনের হিসাবের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৯০৮টি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে হয় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪টি। সর্বশেষ চলতি বছরের জুন শেষে এই সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার।

অর্থনীতিতে আমানত ও সম্পদ বৃদ্ধির এই প্রবণতা একদিকে ব্যাংকিং খাতে অর্থের প্রবাহ বাড়ার ইঙ্গিত দিলেও অন্যদিকে এর সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে সমভাবে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আনছে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যখন বাড়ছে, তখন বড় আমানতকারীদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির এই চিত্র দেশের আয় ও সম্পদ বণ্টনের বৈষম্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা