প্রচলিত রয়েছে, ‘দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা করতে হয়’। যদিও বাক্যটি প্রচলিত, তবে বাস্তবসম্মত।
সঠিক সময় সঠিকভাবে দাঁতের সঠিক যত্ন নেওয়া না হলে অকালেই নষ্ট হয় দাঁত।
দাঁত নষ্ট হলে বিভিন্ন মুখরোচক খাবার খাওয়া ও মুখের সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত হতে হবে আপনাকে। যা থেকে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ ও খাবারের পুষ্টি থেকে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে শরীর। এ কারণে দাঁত থাকতেই দাঁতের সঠিক পরিচর্যা করা উচিত।
দাঁতের যত্নে খুব সাধারণ একটি বিষয় হচ্ছে ব্রাশ করা। এ ক্ষেত্রে একেকজনের একেক প্রতিষ্ঠানের টুথপেস্ট পছন্দ। কিন্তু টুথপেস্ট ক্রয়ের সময় প্রায় সবাই হয়তো খেয়াল করে দেখেছেন, টুথপেস্ট টিউবের নিচে কিছু সাধারণ রং-সংকেতযুক্ত বা কালার কোড থাকে, যা দেখে কেউ কেউ ভাবেন―রংগুলো হয়তো পেস্টের উপাদান নির্দেশ করে। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও এমন কিছু ছড়িয়ে থাকে মাঝে মধ্যে, যা দেখে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে।
স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম হেলথলাইনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেস্টের এই উপাদান নির্দেশের তথ্যটি সম্পূর্ণ ভুল।
ছড়িয়ে পড়া দাবি অনুযায়ী―সবুজ রং সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পেস্ট, নীল প্রাকৃতিক ও ওষুধযুক্ত, লাল হচ্ছে প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক এবং কালো রং হচ্ছে সম্পূর্ণ রাসায়নিক উপাদানে তৈরি পেস্ট। প্রকৃত অর্থে ছড়িয়ে পড়া এই দাবি একেবারেই ভুল।
টুথপেস্টের টিউবের এই রংিন দাগের সঙ্গে পেস্টের উপকরণের কোনো সম্পর্ক নেই। মূলত, উপাদান প্রক্রিয়ার সময় তৈরি হওয়া একটি চিহ্ন মাত্র।
লাইট বিম সেন্সর বা আলোক সংবেদনশীল যন্ত্র চিহ্নগুলো শনাক্ত করে। যা মেশিনকে সংকেত পাঠায় যে, প্যাকেটের ঠিক কোন স্থানটি কাটতে হবে, ভাজ করতে হবে কিংবা কোথায় সিল বসাতে হবে।
টিউবের গায়ের এই চিহ্নগুলো বিভিন্ন রংের হতে পারে। এসব শুধু সবুজ, নীল, লাল ও কালো রংের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্যাকেজিং বা ভিন্ন ভিন্ন সেন্সর ও মেশিনের সুবিধার জন্য আলাদা রং ব্যবহার করা হয়। অন্যাথায় সব রংের অর্থ বা কাজ একই। তবে পেস্টে ঠিক কী উপাদান রয়েছে তা জানতে পেস্টের বক্সে মুদ্রিত উপাদান তালিকা দেখুন।
টুথপেস্টের উপাদানসমূহ
হিউমেক্ট্যান্ট : টুথপেস্ট খোলার পর সেটি জমাট বাঁধা বা শক্ত হওয়া রোধ করার জন্য ব্যবহৃত হয় উপাদানটি। যেমন- গ্লিসারল ও সরবিটল।
সলিড অ্যাবেসিভ : খাবারের অবশিষ্টাংশ দূর করার জন্য এবং দাঁত চকচক করতে ব্যবহার করা হয় উপাদানটি। যেমন- ক্যালসিয়াম কার্বোনেট ও সিলিকা।
বাইন্ডিং মেটেরিয়াল বা থিকেনিং এজেন্ট : পেস্টের উপাদানগুলোকে স্থিতিশীল রাখার জন্য এবং এসবকে আলাদা হওয়া রোধ করতে ব্যবহৃত হয় উপাদানটি। যেমন- কার্বক্সিমিথাইল সেলুলোজ, ক্যারেজেন্স ও জ্যান্থান গাম।
ফ্লেভারিং এজেন্ট : উপাদানটি মূলত স্বাদের জন্য ব্যবহার করা হয় এবং এটি থেকে ক্যাভিটি বা ক্ষয় হয় না। যেমন- স্পিয়ারমিন্ট, পেপারমিন্ট, অ্যানিস বা মৌরি, বাবলগাম বা দারুচিনি।
ফ্লুরাইড : এটি হচ্ছে প্রাকৃতিক খনিজ উপাদান, যা দাঁতের এনামেল শক্ত করার জন্য এবং ক্যাভিটি রোধ করতে পরিচিত। তবে উপাদানটি পেস্টের উপাদান তালিকায় সোডিয়াম ফ্লুরাইড, সোডিয়াম মোনোফ্লুরোফসফেট বা সোডিয়াম স্ট্যানাস ফ্লুরাইড হিসেবে লেখা থাকতে পারে।
টুথপেস্টের প্রকারভেদ
হোয়াইটেনিং (দাঁত সাদা করার) : দাঁতের দাগ দূর করার জন্য এবং উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করতে এতে কারবামাইড পেরোক্সাইড বা হাইড্রোজেন পেরোক্সাইড থাকে।
সেনসিটিভ দাঁতের জন্য : সেনসিটিভি দাঁতের টুথপেস্টে পটাশিয়াম নাইট্রেট বা স্ট্রনটিয়াম ক্লোরাইডের মতো সংবেদনশীলতা দূর করার উপাদান থাকে। কখনো গরম কফিতে চুমুক দেয়ার পর বা আইসক্রিম খাওয়ার সময় যদি দাঁতে তীব্র শিরশিরানি অনুভব হয়, তাহলে এ জাতীয় টুথপেস্ট ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়।
প্লাক কনট্রোল বা টারটার : এটি হচ্ছে শক্ত হয়ে যাওয়া প্লাক। টারটার প্রতিরোধের জন্য তৈরি টুথপেস্টে জিংক সাইট্রেট বা ট্রাইক্লোসান উপাদান থাকতে পারে। এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ট্রাইক্লোসানযুক্ত পেস্ট অন্যান্য সাধারণ পেস্টের তুলনায় প্লাক, মাড়ির প্রদাহ, মাড়ি থেকে রক্ত পড়া ও দাঁতের ক্ষয় দূর করতে কার্যকরী।
প্রাকৃতিক বা হারবাল : প্রাকৃতিক ও ভেষজ পেস্টগুলোয় ফ্লুরাইড ও সোডিয়াম লরিল সালফেট এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়। এতে বেকিং সোডা, অ্যালোভেরা, অ্যাক্সিভেটেড চারকোল, ইসেনশিয়াল অয়েল ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ নির্যাস থাকতে পারে। কিন্তু এসবের স্বাস্থ্যগত দাবি বিষয়টি এখনো পুরোপুরি প্রমাণিত নয়।
সবশেষ, টুথপেস্টের টিউবের নিচে থাকা রং বা কালার কোড কিছুই নির্দেশ করে না। পেস্ট কেনার সময় সেটির স্বাস্থ্যগত দিক গ্রহণযোগ্য কি-না তার সিল, মেয়াদ সংক্রান্ত তথ্য এবং পছন্দের ফ্লেভার দেখে কেনা উচিত।