মাগরিবের নামাজের পর মসজিদজুড়ে নেমে আসে নীরবতা। সেই নীরবতা ভেঙে ভেসে আসে পবিত্র কোরআনের আয়াত পাঠের শব্দ। মসজিদের মেঝেতে গোল হয়ে বসে আছেন কয়েকজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ। কারও হাত কাঁপছে, কারও চুলে পাক ধরেছে, কারও পিঠ নুয়ে গেছে বার্ধক্যের ভারে। তবু কোরআন শেখার আগ্রহে তাদের চোখেমুখে রয়েছে অন্যরকম প্রত্যয়।
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলায় জীবনের পড়ন্ত সময়ে এসে কোরআন শিক্ষার এমন অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন অর্ধশতাধিক প্রবীণ শ্রমজীবী মানুষ। ছোটবেলায় দারিদ্র্য, কর্মব্যস্ততা ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে যারা কোরআন শেখার সুযোগ পাননি, জীবনের পাঁচ দশক পার করে তারাই এখন নিয়মিত শিখছেন পবিত্র কোরআন। পাশাপাশি রপ্ত করছেন শুদ্ধভাবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের নিয়মকানুন।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাতে কামারখন্দ উপজেলা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে গিয়ে দেখা যায় এমনই অনুপ্রেরণাদায়ী দৃশ্য। ‘শেখ আব্দুস সালাম ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে বিনা মূল্যে মাদানি পদ্ধতিতে কোরআন শিক্ষা সম্পন্ন করা ৪২ জন প্রবীণ শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেওয়া হয় কোরআন শরিফ।
জানা যায়, গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সবজি বিক্রেতা এসব প্রবীণকে কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন উপজেলা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমাম আব্দুল মোমেন। প্রতিদিন মাগরিবের নামাজের পর থেকে এশার আজান পর্যন্ত চলে তাদের পাঠদান।
বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা বোর্ডের পরিচালক মাওলানা ক্বারী মুয়াজ নোমানী জানান, এটি তাদের কোরআন শিক্ষা কার্যক্রমের দ্বিতীয় ব্যাচ। ২০২৫ সালের ৯ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে এ ব্যাচের পাঠদান শুরু হয়। সারা দিনের পরিশ্রমের পরও প্রবীণ শিক্ষার্থীরা নিয়মিত মসজিদে এসে কোরআন শিখেছেন।
তিনি বলেন, দ্বিতীয় ব্যাচের কার্যক্রম শেষ হতে আরও তিন মাস বাকি রয়েছে। এরপর তৃতীয় ব্যাচের কার্যক্রম শুরু হবে। স্থানীয় প্রবীণদের মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারে বিনা মূল্যের এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে কোরআন বিতরণের অনুষ্ঠানে ছিল আরও একটি বিশেষ আয়োজন। লটারির মাধ্যমে ৭০ বছর বয়সী শফিকুল ইসলাম তারাকে বিনা খরচে ওমরাহ পালনের সুযোগ দিয়েছে ‘স্যাম ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস’। এমন উপহার পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
অনুষ্ঠানে ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় ও হাদিসের আলোকে আলোচনা করেন আমন্ত্রিত অতিথিরা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কামারখন্দ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লা আল মামুন, শেখ আব্দুস সালাম ফাউন্ডেশনের বয়স্ক কোরআন শিক্ষা কার্যক্রমের পরিচালক মাওলানা ক্বারী মো. মুয়াজ মোহা, বেলকুচি ওলামা ঐক্য পরিষদের সেক্রেটারি হাফেজ মো. রফিকুল ইসলামসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
বয়স যে কোরআন শেখার পথে বাধা নয়, কামারখন্দের এই প্রবীণ শ্রমজীবীরাই তার অনুপ্রেরণাদায়ী উদাহরণ।