September 12, 2026, 6:06 am

স্যাটেলাইটের ছবিতে সৌদি আরবের একটি পাম্পিং স্টেশনে আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

বাব আল-মান্দেবের দ্বীপে হুতিদের উপস্থিতি, সৌদির তেল পাইপলাইন বন্ধ

কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালির পেরিম দ্বীপে ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধাদের উপস্থিতির খবরে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই ইরাক থেকে আসা ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ইয়েমেন সরকারের চারটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানায়, হুতি যোদ্ধারা পেরিম দ্বীপে পৌঁছেছে। দ্বীপটির অবস্থান বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হওয়ায় সেখানে হুতিদের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে তাদের প্রভাব আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

সৌদি-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের দুটি সূত্র জানিয়েছে, তাদের বাহিনী পেরিম দ্বীপ থেকে সরে গেছে। একই সময়ে হুতিরা লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী ধুবাব শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। শহরটি পেরিম দ্বীপের ঠিক বিপরীতে অবস্থিত।

সৌদির তেল পাইপলাইন বন্ধ

হুতিদের অগ্রযাত্রার মধ্যেই সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানোর গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ।

সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের বরাতে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে একাধিক হামলার পর এর কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাইপলাইনটির মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছে বলে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশ্লেষকদের তথ্যের বরাতে জানা গেছে। এই পরিমাণ বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ।

তবে পাইপলাইনে হামলা কারা চালিয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলায় ব্যবহৃত ড্রোনগুলো ইরাক থেকে এসেছে। দেশটিতে ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র মিলিশিয়ার উপস্থিতি রয়েছে।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে। তবে এর ফলে সৌদির তেল রপ্তানিতে ঠিক কী ধরনের প্রভাব পড়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে সৌদি

হুতিদের হামলার আশঙ্কা বাড়তে থাকায় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার অন্তত দুবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা চান বলে রয়টার্সকে জানিয়েছে দুটি সূত্র। এর আগে অ্যাক্সিওসও একই তথ্য প্রকাশ করে।

তবে ওয়াশিংটন আপাতত সরাসরি সামরিক অভিযানে যুক্ত হতে রাজি হয়নি। পরিবর্তে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহায়তার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে যুক্তরাষ্ট্র।

জ্বালানি সরবরাহে বাড়ছে চাপ

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে আরও শক্তিশালী হলে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর প্রভাবের মধ্যে চলে আসতে পারে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তেলের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) শুক্রবার জানিয়েছে, তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল সরবরাহ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। বাব আল-মান্দেব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হুতি-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর হামলাকেও এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

চলমান সংঘাতের মধ্যেও শুক্রবার তেলের দাম কিছুটা কমেছে। তবে সপ্তাহ শেষে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকার পথে রয়েছে দাম, যা মে মাসের মাঝামাঝির পর প্রথমবারের মতো এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

এদিকে হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, সৌদি জাহাজ ছাড়া অন্য সব ধরনের নৌযানের জন্য সামুদ্রিক চলাচল নিরাপদ। তবে সৌদি জাহাজের ওপর আগে ঘোষণা করা নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

বাব আল-মান্দেব ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা, পেরিম দ্বীপে হুতিদের উপস্থিতি এবং সৌদির গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোয় হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠছে।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা