গণপরিবহনে নারী ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। কখনো চলন্ত বাসে একা নারী, তরুণী বা কিশোরীকে পেয়ে ধর্ষণ, কখনো ধর্ষণের পর হত্যা করে নির্জন স্থানে লাশ ফেলে দেওয়া, আবার কখনো যাত্রীকে ছুরিকাঘাত বা মারধর করে সর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার মতো অপরাধে জড়াচ্ছেন পরিবহন শ্রমিকদের কেউ কেউ। ভাড়া নিয়ে বিরোধের জেরেও যাত্রীকে চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন হলেও দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, গণপরিবহনে কর্মরত শ্রমিকদের একটি অংশের এই অপরাধপ্রবণতা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে কে?
পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, দেশে গণপরিবহন খাতে প্রায় ৭০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। এত বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের মধ্যে কে অপরাধপ্রবণ আর কে সৎ, তা যাচাই করা মালিক সমিতির পাশাপাশি প্রশাসনের জন্যও কঠিন। অল্পশিক্ষিত ও অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন এসব শ্রমিকের একটি অংশ মাদকাসক্ত হয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলেও দাবি তাদের।
তাদের ভাষ্য, শ্রমিকদের সচেতন করতে পরিবহন মালিক সমিতিগুলো বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। কারণ কোনো মালিকই চান না একজন মাদকাসক্ত কিংবা অপরাধী ব্যক্তির হাতে গাড়ির চাবি তুলে দিতে।
বারবার ঘটছে গুরুতর অপরাধ
গত ১৫ জানুয়ারি মধ্যরাতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে চলন্ত বাসে এক ছাত্রী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। বাসের অন্য যাত্রীরা নেমে যাওয়ার পর চালক, হেলপারসহ তিনজন ওই ছাত্রীকে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে পুলিশ তিনজনকে আটক করে। তাদের বয়স ছিল ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে।
এর আগে ২০২২ সালের ৩ আগস্ট একই মহাসড়কে চলন্ত বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
২০১৭ সালের আগস্টে চলন্ত বাসে একা পেয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মী রূপা খাতুনকে। এ ঘটনায় বাসের চালক, হেলপারসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।
২০১৮ সালের জুলাইয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ শিক্ষার্থী সাইদুর রহমান পায়েলকে বাস থেকে নদীতে ফেলে হত্যা করা হয়। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ওই বাসের চালক ও দুই সহকারী আদালতে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।
একই বছরের ৮ এপ্রিল ঢাকার ধামরাই এলাকায় চলন্ত বাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন তৈরি পোশাকশিল্পের এক নারী শ্রমিক। রাত ২টার দিকে বাসের চালক, হেলপারসহ চারজন তাকে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
সর্বশেষ গত ৪ সেপ্টেম্বর রাতে ইসমাইল নামে এক ব্যক্তিকে বাসের ভেতরে হত্যা করে লাশ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, জমি বিক্রির পাঁচ লাখ টাকা ছিনিয়ে নিতে বাসের চালক, হেলপার ও সুপারভাইজার তাকে হত্যা করেন। এ ঘটনায় ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সী তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে চালক সোহেল রানা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
কেন অপরাধের দিকে ঝুঁকছেন কেউ কেউ?
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সমাজে অস্থিরতা বৃদ্ধি, নৈতিকতার অবক্ষয় এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বাড়াতে পারে। ব্যক্তিভেদে অপরাধ করার প্রবণতাও থাকতে পারে। বিশেষ করে মাদকাসক্তির সঙ্গে অপরাধপ্রবণতার সম্পর্ক রয়েছে। মাদক গ্রহণের ফলে মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে অপরাধমূলক আচরণকে উসকে দিতে পারে।
‘গণপরিবহন শ্রমিকদের বেশিরভাগই নেশাগ্রস্ত’
বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর খান বলেন, গণপরিবহন শ্রমিকদের বড় একটি অংশ নেশাগ্রস্ত। তাদের কেউ কেউ রাতে ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।
তিনি বলেন, রাত ১০টার পর পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল বাড়ে। ফলে ওই সময়ে সড়কে ব্যস্ততা বাড়ার পাশাপাশি অপরাধ সংঘটনের সুযোগও তৈরি হয়। একজন চালক সারাদিন গাড়ি চালানোর পর যেখানে গাড়ি পার্ক করা হয়, সেই পরিবেশও অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। পাশাপাশি শ্রমিকদের বিনোদনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় তাদের একটি অংশ অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
জাহাঙ্গীর খান বলেন, বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার সময় ডোপ টেস্ট না করে সড়ক-মহাসড়কে নিয়মিতভাবে মাদকাসক্ত পরিবহন শ্রমিকদের শনাক্ত করতে ডোপ টেস্ট চালু করা প্রয়োজন।
প্রশাসনের সহযোগিতা চান মালিক সমিতির নেতারা
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী জোবায়ের মাসুদ বলেন, গণপরিবহনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের বেশিরভাগই রাতে সংঘটিত হয়। বিপুলসংখ্যক পরিবহন শ্রমিককে নিয়ন্ত্রণ করাও সহজ নয়।
তিনি বলেন, কোনো শ্রমিক অপরাধে জড়ালে সংশ্লিষ্ট পরিবহন মালিক সমিতিকে সতর্ক করা হয়। পাশাপাশি অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতেও সহযোগিতা করা হয়। শ্রমিকদের সচেতন করতে অন্তত মাসে একটি ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।
তার মতে, শুধু মালিক সমিতি নয়, শ্রমিক সংগঠনগুলোকেও আরও সক্রিয় হতে হবে। একই সঙ্গে অপরাধপ্রবণ শ্রমিকদের শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের সহযোগিতাও প্রয়োজন।
নিরাপদ গণপরিবহনের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি
গণপরিবহনে লাখ লাখ শ্রমিকের মধ্যে অল্পসংখ্যক ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো শ্রমিকসমাজের ওপর দেওয়া যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি বিচ্ছিন্ন ঘটনার কথা বলে বিষয়টি উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। নিয়মিত ডোপ টেস্ট, শ্রমিকদের তথ্য যাচাই, সচেতনতা কর্মসূচি, মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নজরদারি এবং প্রশাসনের কঠোর তদারকি একসঙ্গে কার্যকর করা গেলে গণপরিবহনে অপরাধ কমানো সম্ভব হতে পারে।