যশোরের মনিরামপুরে মুক্তেশ্বরী নদী থেকে বস্তাবন্দি এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের চাঞ্চল্যকর ঘটনায় নতুন মোড় নিয়েছে তদন্ত। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন পল্লিচিকিৎসক মিঠুন ধর এবং তাঁকে পালাতে সহযোগিতা করার অভিযোগে আব্দুল হান্নান গাজী নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করার সময় সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার ভাদালিয়া এলাকা থেকে তাঁদের আটক করা হয়।
গত ৭ নভেম্বর শনিবার সকালে মনিরামপুর উপজেলার মশিয়াহাটীর হেলারঘাট এলাকায় মুক্তেশ্বরী নদীতে বস্তাবন্দি অবস্থায় রঞ্জন মণ্ডল (৬০) নামে এক ব্যক্তির মরদেহ পাওয়া যায়। তিনি কেশবপুর উপজেলার সুফলাকাটি ইউনিয়নের কালিচরণপুর গ্রামের বাসিন্দা। পেশায় ঘের ব্যবসায়ী রঞ্জন মণ্ডলের বাবার নাম মৃত হরিপদ মণ্ডল।
নদীতে মরদেহ ভেসে ওঠার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে এবং হত্যাকাণ্ডের সম্ভাবনা সামনে রেখে তদন্ত শুরু করে। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় জেলা পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় একটি বিশেষ দল বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও ঘটনার রহস্য অনুসন্ধানে কাজ শুরু করে।
তদন্তের শুরুতেই নিহত ব্যক্তির সর্বশেষ অবস্থান এবং তাঁর সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছিলেন, তা জানার চেষ্টা করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ সময় স্থানীয় বাজারের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র পাওয়া যায়। ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, মৃত্যুর আগে রঞ্জন মণ্ডল পল্লিচিকিৎসক মিঠুন ধরের চেম্বারে গিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর তাঁকে আর নিজ এলাকায় ফিরে আসতে দেখা যায়নি।
এই তথ্যের ভিত্তিতে মিঠুন ধরের অবস্থান শনাক্ত করতে তাঁর চেম্বার ও বাড়িতে খোঁজ চালানো হয়। তবে সেখানে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর মোবাইল ফোনও বন্ধ থাকায় তদন্তকারীরা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন। পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান ও গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে তাঁর সম্ভাব্য অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পান তদন্তকারীরা।
পুলিশের অনুসন্ধানে জানা যায়, মিঠুন ধর সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার ভাদালিয়া সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে ভারতে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। খবর পাওয়ার পর স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় সীমান্ত এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে মিঠুন ধরকে আটক করার পাশাপাশি তাঁকে পালিয়ে যেতে সহায়তার অভিযোগে আব্দুল হান্নান গাজীকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রঞ্জন মণ্ডল ও মিঠুন ধরের মধ্যে আগে থেকেই পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাঁদের একসঙ্গে চলাফেরা এবং সামাজিক যোগাযোগও ছিল। এই সম্পর্কের আড়ালে কোনো আর্থিক বিরোধ, লেনদেন কিংবা অন্য কোনো স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল কি না, তা অনুসন্ধান করছেন তদন্তকারীরা। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রকৃত কারণ কী, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
গ্রেপ্তার মিঠুন ধরকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা, ঘটনার পূর্বাপর পরিস্থিতি এবং মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে। এ জন্য তাঁকে আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। রিমান্ড মঞ্জুর হলে তাঁর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এ ঘটনায় আরও কেউ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল কি না, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা কোথায় ও কীভাবে করা হয়েছিল এবং মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়ার পেছনে কারা ভূমিকা রেখেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
রহস্যজনক এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দুজন গ্রেপ্তারের পরও রঞ্জন মণ্ডলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে কৌতূহল কাটেনি স্থানীয়দের। এখন তদন্তের পরবর্তী ধাপে জিজ্ঞাসাবাদ ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে পুরো ঘটনার রহস্য উন্মোচনের অপেক্ষায় রয়েছেন এলাকাবাসী।
জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর প্রতিনিধি: