November 2, 2026, 7:59 pm

মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারলে কি ক্ষমতা ছাড়তে হবে ট্রাম্পকে?

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বাড়ছে। আগামীকাল ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি। বিপরীতে, প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাওয়ার আশা করছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা। তবে এই নির্বাচনে রিপাবলিকানরা পরাজিত হলেও কি প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়তে হবে ট্রাম্পকে? এর উত্তর হলো, না। মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয় প্রেসিডেন্টের মেয়াদে সরাসরি কোনো প্রভাব ফেলে না। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের জন্য বাকি মেয়াদে নিজের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে।যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি দুই বছর পরপর কংগ্রেসের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে এই ভোট হয় বলে একে মধ্যবর্তী বা ‘মিডটার্ম’ নির্বাচন বলা হয়।

মার্কিন কংগ্রেসের দুটি কক্ষ, সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ। এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টিতে ভোট গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া ও মিশিগানসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

সিনেটররা ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর। ফলে প্রতি মধ্যবর্তী নির্বাচনেই প্রতিনিধি পরিষদের সব আসনে ভোট হয়, আর সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

বর্তমানে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে রিপাবলিকানদের। তবে ট্রাম্পের জনসমর্থন কমে আসায় নির্বাচনী লড়াইয়ে সুবিধা পাওয়ার আশা করছে ডেমোক্র্যাটরা।

জরিপভিত্তিক ওয়েবসাইট সিলভার বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে ট্রাম্পের প্রতি জনসমর্থন ছিল ৫০ শতাংশের কিছু বেশি। অক্টোবরের শুরুতে তা কমে প্রায় ৩৭ শতাংশে দাঁড়ায়। বিপরীতে, তার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রায় ৬১ শতাংশ মানুষ।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানে সামরিক হামলা শুরুর সময় ট্রাম্পের জনসমর্থন ছিল প্রায় ৪২ শতাংশ। হামলার পর তা আরও কমে ৪০ শতাংশের নিচে নেমে আসে।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের একই সময়ে তার জনসমর্থন ছিল প্রায় ৪৩ শতাংশ। আর জো বাইডেনের প্রেসিডেন্সির একই পর্যায়ে এই হার ছিল ৪০ শতাংশ। অতীতে দুই প্রেসিডেন্টের আমলেই মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল ক্ষমতাসীন দল। তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পেরেছিল তারা।

এবারও একই ধরনের ফলাফলের আশঙ্কা করছে রিপাবলিকানরা। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ইতিহাসে মধ্যবর্তী ভোটে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলকে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। ট্রাম্পের জনসমর্থন কমে যাওয়ায় রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও নজর দিচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ অর্থনীতি। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

রিপাবলিকানরা অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে সরকারের কঠোর পদক্ষেপকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে পণ্যের দাম বেড়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও চাপে পড়েছে।

এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার ও এর নিয়ন্ত্রণ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। দুই দলের রাজনীতিবিদদের অনেকেই এআই নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন।

যদিও মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের নাম ব্যালটে থাকছে না, তবু ভোটারদের কাছে তাঁর সরকারের কর্মকাণ্ডই নির্বাচনী আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়। এই ভোটকে তাই ট্রাম্পের নেতৃত্ব ও নীতির প্রতি জনসমর্থন যাচাইয়ের পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসন ২১৮টি। কক্ষটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে সিনেটে দলটির আসন ৫৩টি।

সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য আসনসংখ্যার সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে সিনেটে কোনো পক্ষের আসন সমান হলে ভাইস প্রেসিডেন্টের নির্ণায়ক ভোটের সুযোগ থাকে।

ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেট যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ট্রাম্পের জন্য আইন পাস করানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বিরোধী দল তখন নিজেদের আইন প্রস্তাব উত্থাপন এবং সরকারের নীতির বিরোধিতা করার আরও সুযোগ পাবে।

একই সঙ্গে কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত চালানোর ক্ষমতাও বাড়বে ডেমোক্র্যাটদের। হোয়াইট হাউসের নতুন বলরুম নির্মাণ, দুর্নীতির অভিযোগ এবং অভিবাসনবিষয়ক সংস্থা আইসের (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) কার্যক্রম নিয়ে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও নীতির ওপর কংগ্রেসের নজরদারি বাড়বে। ফলে তার সরকারের বাকি মেয়াদে রাজনৈতিক বিরোধ ও নীতিগত অচলাবস্থা তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পকে অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না, তা নিয়েও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

অভিশংসন হলো প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনে কংগ্রেসে আনুষ্ঠানিক বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করার সাংবিধানিক ব্যবস্থা। তবে প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসনের অভিযোগ গৃহীত হলেই প্রেসিডেন্টকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পদ ছাড়তে হয় না। তাকে পদ থেকে অপসারণের জন্য সিনেটে দোষী সাব্যস্ত করার মতো প্রয়োজনীয় সমর্থনও অর্জন করতে হয়।

অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা যদি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে, তাহলে ট্রাম্পের জন্য নিজের নীতিগুলো বাস্তবায়নের পথ তুলনামূলক সহজ থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ২২তম সংশোধনী অনুযায়ী, ট্রাম্পের পক্ষে তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া সম্ভব নয়। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল শুধু তাঁর বর্তমান মেয়াদের রাজনৈতিক পরিস্থিতিই নয়, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে দলীয় হিসাব-নিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে।

রিপাবলিকান পার্টিতে ট্রাম্পের সম্ভাব্য উত্তরসূরি কে হবেন এবং ডেমোক্র্যাটদের প্রার্থী হিসেবে কে সামনে আসবেন, তা নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হতে পারে।

সব মিলিয়ে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজিত হলেও ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়তে হবে না। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বিরোধীদের হাতে চলে গেলে তার নীতি বাস্তবায়ন, প্রশাসনের কার্যক্রম পরিচালনা এবং রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।

সূত্র: বিবিসি

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা