ডুমুরিয়া (খুলনা) প্রতিনিধি:
মা ইলিশ সংরক্ষণে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় প্রথমবারের মতো সরকারি খাদ্যসহায়তা পাচ্ছেন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ৬৪৬ জন জেলে। দীর্ঘদিন এ সহায়তার বাইরে থাকা জেলেদের তালিকাভুক্ত করে বিশেষ ভিজিএফের চাল দেওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে তাঁদের পরিবারে। সহায়তার খবর পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন কয়েকজন মৎস্যজীবী।
উপজেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ডুমুরিয়ায় নিবন্ধিত মৎস্যজীবীর সংখ্যা ৫ হাজার ৪৯৮ জন। এর আগে সাগরে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় ৬৬৫ জন জেলে বিশেষ ভিজিএফের চাল পেতেন। তবে মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণ এবং সুন্দরবনে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় উপজেলার জেলেদের জন্য এ ধরনের সহায়তার সুযোগ ছিল না। ফলে নিষেধাজ্ঞার দিনগুলোতে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম সংকটে পড়তেন অনেক জেলে।
মাছ ধরতে না পেরে কেউ ভ্যান বা রিকশা চালিয়ে, কেউ দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাতেন। অনেক পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ত। বিশেষ করে সাগরের মোহনা ও সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা জেলেদের দুর্ভোগ ছিল বেশি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডুমুরিয়া উপজেলা মৎস্য বিভাগের উদ্যোগে বোট নিবন্ধন ও সাগরে মাছ ধরার অনুমতিপত্র সংগ্রহের কার্যক্রমের ফলে জেলেদের সরকারি সহায়তার আওতায় আসার সুযোগ তৈরি হয়। আগে বোটগুলোর নিবন্ধন ও অনুমতিপত্র না থাকায় সরকারি নথিতে সেগুলোর তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষিত ছিল না। পরে ২০২৫ সালে ৬৪টি বোটের অনুমতিপত্রের ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিটি বোটে প্রায় ৮ থেকে ১৪ জন জেলে সাগরের মোহনা ও সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় মাছ ধরতে যান।
এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় এবার মা ইলিশ সংরক্ষণকালীন বিশেষ ভিজিএফের চাল পাচ্ছেন ৬৪৬ জন মৎস্যজীবী। দীর্ঘদিন পর সরকারি সহায়তা পেয়ে তাঁরা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। জেলেরা জানান, মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও সংসারের খরচ, সন্তানদের পড়াশোনা ও খাবারের ব্যবস্থা থেমে থাকে না। এমন সময়ে সরকারি চাল তাঁদের পরিবারের খাদ্যসংকট মোকাবিলায় সহায়তা করবে।
এ উদ্যোগের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য আলী আসগর লবি, বর্তমান সরকার ও উপজেলা মৎস্য বিভাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন জেলেরা। তাঁদের ভাষ্য, অতীতে মা ইলিশ সংরক্ষণকালীন এমন সহায়তা তাঁরা পাননি। দীর্ঘদিনের বঞ্চনার কথা বলতে গিয়ে কয়েকজন মৎস্যজীবী কান্নায় ভেঙে পড়েন।
জেলেরা বলেন, মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষায় নির্ধারিত সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখা জরুরি। এতে ইলিশের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়। তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে হলে জেলেদের জীবন-জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। তাই মা ইলিশ সংরক্ষণকালীন সহায়তার পাশাপাশি জাটকা সংরক্ষণ ও সুন্দরবনে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়ও সরকারি সহায়তা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
মৎস্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের খাদ্যসহায়তা দেওয়া হলে তাঁদের আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে। পাশাপাশি আইন মেনে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে জেলেদের জীবন-জীবিকার সুরক্ষার পাশাপাশি মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ কার্যক্রমও সহজ হবে।
ডুমুরিয়া উপজেলার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সোহেল মো. জিল্লুর রহমান রিগান বলেন, “জেলেদের জীবন-জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাগরে মাছ ধরার অনুমতিপত্র প্রদানের মাধ্যমে তাঁদের সরকারি নথিভুক্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে মা ইলিশ সংরক্ষণকালীন বিশেষ ভিজিএফের আওতায় ৬৪৬ জন মৎস্যজীবীকে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। দীর্ঘদিন তাঁরা এই সহায়তা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। জেলে পরিবারগুলোতে এখন আনন্দ বিরাজ করছে। আমরা মৎস্যচাষি ও মৎস্যজীবীদের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছি। ভবিষ্যতেও সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁদের কল্যাণে কার্যক্রম পরিচালনা এবং মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।”