October 9, 2026, 10:29 pm

যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবার অনলাইনে সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা, ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড ঘিরে বিতর্ক

যুক্তরাষ্ট্রে ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি ইন্টারনেটে সম্প্রচারের পরিকল্পনা ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। ২০০৯ সালে টেক্সাসের ফোর্ট হুডে ১৩ জন নিরস্ত্র সহকর্মীকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত সাবেক সেনা মেজর নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ডকে কেন্দ্র করে এ আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে সম্প্রচারের পরিকল্পনা, আইনি প্রক্রিয়া এবং দণ্ড কার্যকরের সময়সূচি নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী ৩ ডিসেম্বর হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিরক্ষা বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে দণ্ড কার্যকরের দৃশ্য অনলাইনে সরাসরি সম্প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পেন্টাগনের মুখপাত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছেন।

হেগসেথের ভাষ্য, এমন গুরুতর অপরাধের পরিণতি মানুষকে স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে হবে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় সেনাসদস্যরা ফায়ারিং স্কোয়াডে উপস্থিত থাকবেন বলেও তিনি জানান। হাসান শেষ কোনো ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন কি না কিংবা প্রেসিডেন্টের কাছে আবেদন জানিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, এসব বিষয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন।

তবে মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা নিয়ে আইনজীবী, রাজনীতিক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের নিয়ে কাজ করা আইনজীবী জন মিলস এ উদ্যোগকে নজিরবিহীন ও আইনি জটিলতাপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি সিএনএনকে বলেন, এভাবে মৃত্যুদণ্ড প্রদর্শন অত্যন্ত আপত্তিকর এবং তা জঙ্গিগোষ্ঠী আইসিসের বর্বর কর্মকাণ্ডের কথা মনে করিয়ে দেয়। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকও এ পদক্ষেপকে ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ বলে মন্তব্য করেছেন।

ফোর্ট হুডের হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়েও বেঁচে যাওয়া সাবেক সেনা সার্জেন্ট আলোনজো লুনসফোর্ড মনে করেন, হাসানের অপরাধের জন্য ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড উপযুক্ত শাস্তি। তবে শিশুদের ওপর সরাসরি সম্প্রচারের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে হামলায় নিহত ও আহত সেনাসদস্যদের পরিবারের সদস্যদের দণ্ড কার্যকরের দৃশ্য দেখার সুযোগ থাকা উচিত বলে মনে করেন লুনসফোর্ড।

আইনগত দিক থেকে বিষয়টি আরও জটিল। ফোর্ডহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ডেবোরা ডেনোর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় নির্দিষ্ট সাক্ষী ও সাংবাদিকদের উপস্থিতির নজির থাকলেও ইন্টারনেটে সরাসরি সম্প্রচারের নজির নেই। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা, অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষা এবং সম্প্রচারের সীমাবদ্ধতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠতে পারে।

অন্যদিকে, জন মিলসের দাবি, হাসানের আপিল প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। উচ্চ আদালতে আবেদন করা হলে দণ্ড কার্যকরে স্থগিতাদেশ আসতে পারে। তাঁর মতে, সরাসরি সম্প্রচারের এ উদ্যোগ ট্রাম্প প্রশাসনের মনোযোগ আকর্ষণের প্রচেষ্টা।

২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর ফোর্ট হুডের সেনাঘাঁটিতে হামলায় ১৩ জন নিহত ও বহু মানুষ আহত হন। হামলার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হাসান ২০১৩ সালে সামরিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড পান। সে সময় তিনি দাবি করেছিলেন, আফগানিস্তানে তালেবান ও মুসলিমদের রক্ষার উদ্দেশ্যেই তিনি ওই হামলা চালিয়েছিলেন।

মার্কিন সামরিক বাহিনীতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ইতিহাসও দীর্ঘদিনের। ১৯৬১ সালে সর্বশেষ এক সেনাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। আর ফায়ারিং স্কোয়াডে সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সর্বশেষ ঘটনা ঘটে ১৯৪৫ সালের জানুয়ারিতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। দীর্ঘ বিরতির পর হাসানের দণ্ড কার্যকর হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করবে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ১৭টি দেশে দুই হাজার ৭০০-এর বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা মূলত ইরান ও আফগানিস্তানে নথিভুক্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও মৃত্যুদণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। এর সঙ্গে সরাসরি অনলাইন সম্প্রচারের পরিকল্পনা যুক্ত হওয়ায় বিচার, মানবাধিকার, জনস্বার্থ ও প্রযুক্তিগত নীতিমালা নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা