ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাম্প্রতিক কয়েকটি উদ্যোগ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অনুমোদন ছাড়া স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, ডাকসু সংগ্রহশালায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শন এবং শিক্ষকদের মূল্যায়নে পৃথক ওয়েবসাইট চালুর মতো কর্মকাণ্ডকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
প্রশাসনের ভাষ্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে গত ৫ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্য এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
তবে প্রশাসনের অভিযোগ, ডাকসু ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে কলাভবনসংলগ্ন ডাকসু ভবনের পশ্চিম পাশে এবং কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে দুটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছে। এসব স্থাপনা নির্মাণের আগে সিন্ডিকেট বা উপাচার্যের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এমনকি এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে কোনো আলোচনাও করা হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডার, ১৯৭৩-এর ২৪(এ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তির তদারকি, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সিন্ডিকেটের। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের Ordinances and Regulations-এর Chapter XIV-এর ধারা ৪-এর নোট অনুযায়ী, ছাত্র সংসদকে উপাচার্যের নির্দেশনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ ডাকসুর এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।
জিন্নাহ ও আব্দুল মালেকের ছবি নিয়েও আপত্তি
ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টিও মেনে নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
প্রশাসনের দাবি, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
শিক্ষক মূল্যায়নে পৃথক ওয়েবসাইট
শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য ডাকসুর উদ্যোগে অনুমোদন ছাড়া পৃথক ওয়েবসাইট চালুর বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
কর্তৃপক্ষ বলেছে, শিক্ষক মূল্যায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ‘টিচিং ইভালুয়েশন’ নীতিমালা রয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুমোদিত। তাই অনুমোদিত কাঠামোর বাইরে পৃথক কোনো শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর সুযোগ নেই।
প্রশাসনের আরও অভিযোগ, ডাকসুর চালু করা ওই ওয়েবসাইটে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, এ ধরনের কর্মকাণ্ড আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত নীতিমালার বাইরে গিয়ে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করার শামিল বলেও জানিয়েছে প্রশাসন।
‘দ্বৈত প্রশাসন’ মেনে নেওয়া হবে না
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ধরনের ‘দ্বৈত প্রশাসন’ প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই। ডাকসু ছাত্রপ্রতিনিধিত্বশীল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলেও এর কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হতে হবে।
প্রশাসনিক কর্তৃত্বকে পাশ কাটিয়ে কোনো সমান্তরাল কাঠামো বা প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মর্যাদা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো আপস করা হবে না বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুমোদন ছাড়া স্থাপনা নির্মাণ কিংবা পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।