September 14, 2026, 6:04 am

চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানা এলাকার এক বাসিন্দার ছেলেমেয়ে লোডশেডিংয়ের মধ্যে মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়োশানা করছে

চাহিদার দ্বিগুণ বিদ্যুৎ উৎপাদন, তবুও চট্টগ্রামে ৯ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ উৎপাদন হলেও কমছে না লোডশেডিং। নগরীতে দিনে-রাতে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। আর জেলার ১৬ উপজেলা, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কোথাও কোথাও ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।

তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। একই সঙ্গে ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং অনলাইনে কাজ।

উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ, তবুও ঘাটতি

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২ হাজার ৭৭৬ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যা ৭টায় ২ হাজার ৯২৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়।

ওই দিন সন্ধ্যা ৭টায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৪৩১ দশমিক ৯৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১ হাজার ২০৭ দশমিক ৮৯ মেগাওয়াট। ফলে ওই সময়ে ঘাটতি ছিল ২২৪ দশমিক ১০ মেগাওয়াট।

এমনকি অফ-পিক সময়েও ৭৫ দশমিক ৮০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছে।

৩০টি কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ

পিডিবি সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলের সরকারি-বেসরকারি প্রায় ৩০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হচ্ছে। এসব কেন্দ্রের মধ্যে এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার, মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিকলবাহা, জুলদা-২ ও জুলদা-৩ উল্লেখযোগ্য।

গত ১২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় এসএস পাওয়ার থেকে ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। সকাল ১১টায় উৎপাদন ছিল ১ হাজার ১৮০ মেগাওয়াট।

১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সকালে ১ হাজার মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় ৭২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। শিকলবাহা ২২৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে সকাল ও সন্ধ্যা উভয় সময়েই ২১৭ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে।

জুলদা-২ কেন্দ্র থেকে সকালে ১২ ও সন্ধ্যায় ১০০ মেগাওয়াট এবং জুলদা-৩ থেকে যথাক্রমে ১২ ও ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। দোহাজারী ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে সকালে উৎপাদন না হলেও সন্ধ্যায় ৫১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।

এনার্জিপ্যাক কেন্দ্র থেকে সকাল ১১টায় ২৫ দশমিক ০১ ও সন্ধ্যা ৭টায় ৪৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। হাটহাজারী কেন্দ্রের উৎপাদন সকালে ৭ থেকে বেড়ে সন্ধ্যায় ৪৫ মেগাওয়াটে দাঁড়ায়।

বিআর পাওয়ার থেকে সকালে ১৭ ও সন্ধ্যায় ৩৫ মেগাওয়াট এবং বারাকা ৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে সন্ধ্যায় ১৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। বারাকা কর্ণফুলী কেন্দ্র থেকে দুই সময়েই ১৭ মেগাওয়াট করে উৎপাদন হয়।

আনলিমা কেন্দ্র থেকে সকালে ১৫ ও সন্ধ্যায় ১০৭ মেগাওয়াট এবং আনোয়ারা ইউনাইটেড কেন্দ্র থেকে দুই সময়েই ১৬ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়।

কাপ্তাইয়েও ছিল উল্লেখযোগ্য উৎপাদন

কাপ্তাইয়ের জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে।

কাপ্তাই-১ ইউনিট থেকে সকাল ও সন্ধ্যায় ৪৬ মেগাওয়াট করে, কাপ্তাই-২ থেকে যথাক্রমে ৪৬ ও ৫০ মেগাওয়াট, কাপ্তাই-৩ থেকে ৪৬ ও ৪০ মেগাওয়াট এবং কাপ্তাই-৪ থেকে ৪০ ও ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে।

এ ছাড়া আরপিসিএল ২৬ দশমিক ৪ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে সকালে ৮ ও সন্ধ্যায় ১৭ মেগাওয়াট এবং ইউনাইটেড পাওয়ার থেকে যথাক্রমে ২ ও ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।

তবে কয়েকটি নবায়নযোগ্য ও ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন ছিল শূন্য বা সীমিত। কক্সবাজার উইন্ড পাওয়ার, বারাকা শিকলবাহা, দেশ এনার্জি, কেপিজেড সোলার-১ ও ২ এবং রাউজান-১ ও ২ থেকে ওই সময়ে কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়নি।

উৎপাদন বেশি হলেও লোডশেডিং কেন?

চট্টগ্রাম অঞ্চলে সাধারণত বিদ্যুতের চাহিদা ১ হাজার ৪৩১ থেকে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের মধ্যে। অথচ স্থানীয় কেন্দ্রগুলোতে এর চেয়ে অনেক বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। তবে এসব বিদ্যুৎ সরাসরি শুধু চট্টগ্রামে সরবরাহ করা হয় না। বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার পর সেখান থেকে চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকবর হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৩০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। পরে জাতীয় গ্রিড থেকেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।

তিনি জানান, গত রবিবার চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৭৫ থেকে ২২৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুতের লোডশেডিং ছিল।

নগরে দিনে-রাতে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই

তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় নগরবাসীর দুর্ভোগ বাড়ছে। দিনের পাশাপাশি রাতেও বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে অস্বস্তি বাড়ছে।

পাঁচলাইশ থানার সংগীত আবাসিক এলাকার বাসিন্দা কাশবি আক্তার বলেন, দিন-রাতে ৬ থেকে ৭ বার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করে। প্রতিবার প্রায় এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এর সঙ্গে গত এক মাস ধরে গ্যাস সংকটও রয়েছে।

বাকলিয়া থানার এক্সেস রোড সংলগ্ন মৌসুমী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা জামাল উদ্দিন বলেন, ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। রাতে ঘুমানোর সময়ও বিদ্যুৎ থাকে না। একবার চলে গেলে এক থেকে দুই ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ আসে।

উপজেলায় লোডশেডিং ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা

নগরীর তুলনায় চট্টগ্রামের ১৬ উপজেলা, কক্সবাজার এবং তিন পার্বত্য জেলায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরও বেশি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

লোহাগাড়ার বড়হাতিয়া এলাকার বাসিন্দা আহমেদ মুসা বলেন, গ্রামে বিদ্যুতের অবস্থা ভয়াবহ। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং থাকে। এতে দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তীব্র গরমে মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

দীর্ঘ সময়ের এই লোডশেডিংয়ের কারণে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং অনলাইনভিত্তিক কাজও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা