September 9, 2026, 3:05 pm

বিশ্বের ভয়াবহতম হাম প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশ

একসময় হাম নির্মূলের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। তবে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন, টিকার সরবরাহ সংকট এবং কর্মসূচির দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে বর্তমানে দেশটি ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের মুখে পড়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত ৯৯৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে শনাক্ত হয়েছেন ১ লাখ ৬৬ হাজার ৪৬১ জন। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ১৯ হাজার ৮৩৫ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৫৯ জন। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ৪০ হাজার ৮৫০ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, মৃতদের মধ্যে ৮৯৯ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১০০ জনের। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও দুই শিশুর মৃত্যু হওয়ায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৯৯৯-এ দাঁড়িয়েছে। এ প্রাদুর্ভাবকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ হাম পরিস্থিতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের তালিকাতেও বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে। এতে বিপুলসংখ্যক শিশু হাম টিকার সুরক্ষা থেকে বাদ পড়ে যায়। এর ফলে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

হামে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা। প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল এই বয়সের শিশু। এছাড়া নয় মাসের কম বয়সী শিশুরাও বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ এ বয়সে তারা নিয়মিত হাম টিকার আওতায় আসার আগেই আক্রান্ত হতে পারে। টিকাদানের এই ঘাটতিকে বিশেষজ্ঞরা ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ হিসেবে দেখছেন।

গত এক দশকে হাম প্রতিরোধে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। কোভিড-১৯ মহামারির সময় কিছুটা ব্যাঘাত ঘটলেও বেশির ভাগ সময় হাম টিকার আওতা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ করা ৯৫ শতাংশের কাছাকাছি বা তার বেশি ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় সেই অর্জন এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার গত এপ্রিল থেকে সারাদেশে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। প্রথম পর্যায়ে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য থাকলেও পরে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জরুরি টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা এবং বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের জন্য ‘ক্যাচ-আপ’ টিকাদান কর্মসূচি চালানো জরুরি।

এর মধ্যে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। একদিকে হাম আক্রান্ত বিপুলসংখ্যক শিশু, অন্যদিকে ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে হাসপাতালগুলোতে শয্যা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট দেখা দিচ্ছে।

রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালেও হাম আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে। অনেক হাসপাতালে নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় মেঝেতেও চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। শিশুদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্যালাইনের ঘাটতির কথাও জানা গেছে। এতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি দুর্ভোগে পড়েছেন রোগীদের স্বজনরাও।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত টিকাদানের ঘাটতি পূরণ, নিয়মিত টিকাদানের আওতা বাড়ানো, পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত এবং টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করে কর্মসূচির আওতায় আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অত্যন্ত সংক্রামক এই রোগ প্রতিরোধে দুই ডোজ হাম টিকা কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারে।
রয়টার্স:

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা