August 14, 2026, 4:09 pm

থানায় অভিযোগ, এলাকায় তোলপাড়; ১৬ দিনেও রেকর্ড হয়নি মামলা:

মণিরামপুর (যশোর) প্রতিনিধি:

যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ আলী গ্রামে এক কিশোরীকে অপহরণ করে ধর্ষণ, পরে হাত-পা ও মুখ বেঁধে গোয়ালঘরে ফেলে রেখে যাওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলেও ঘটনার ১৬ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও মামলা রেকর্ড না হওয়া এবং তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতির অভাব নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষায়, অভিযোগটি এখন আর কেবল একটি ফৌজদারি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি আইনগত প্রক্রিয়ার ধীরগতি, সম্ভাব্য প্রভাব বিস্তার এবং নেপথ্যের নানা তৎপরতা নিয়ে জনমনে গভীর সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।

এই প্রতিবেদকের হাতে আসা লিখিত অভিযোগে ভুক্তভোগী কিশোরী দাবি করেছেন, একই এলাকার মামুন মোল্ল্যার ছেলে তৌহিদুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় অভিযুক্ত বিভিন্ন সময় তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, চাপ প্রয়োগ এবং ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গত ২৭ জুলাই রাত আনুমানিক ১০টার দিকে অভিযুক্ত কিশোরীর বাড়ির সামনে গিয়ে তাকে বাইরে ডাকে। পরে সুযোগ বুঝে পেছন থেকে তাকে জোরপূর্বক আটক করে তার মুখ ও হাত বেঁধে নিজ বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার পর অভিযুক্ত কিশোরীকে মুক্ত না করে বরং হাত-পা ও মুখ বেঁধে তার নিজের বাড়ির গোয়ালঘরে ফেলে রেখে যায়। কাউকে বিষয়টি জানালে হত্যা করে গুম করে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তীতে ভুক্তভোগীর দাদি তাকে উদ্ধার করেন। অভিযোগপত্রে ঘটনার বিষয়ে অবগত একাধিক ব্যক্তির নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ঘটনার সবচেয়ে আলোচিত অংশ অপরাধের অভিযোগ নয়, বরং অভিযোগের পরবর্তী পরিস্থিতি। স্থানীয়দের দাবি, এমন গুরুতর অভিযোগ থানায় জমা দেওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে যে ধরনের আইনগত তৎপরতা প্রত্যাশিত, তার দৃশ্যমান প্রতিফলন এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। ফলে এলাকাজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে, তদন্ত কোথায় আটকে আছে?

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, অভিযোগ দায়েরের পর প্রথমদিকে ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরাও ন্যায়বিচারের দাবিতে সরব ছিলেন। কিন্তু কয়েকদিন পর পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে যেতে শুরু করে। অভিযোগকারী পরিবার প্রকাশ্যে কথা বলা কমিয়ে দেয় এবং বিষয়টি নিয়ে আগের মতো তৎপরতা আর দেখা যায় না। এই নীরবতার কারণ নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিযোগ দায়েরের পর স্থানীয় পর্যায়ে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি উভয় পক্ষকে নিয়ে একাধিকবার বৈঠক করেছেন বলে দাবি করছে বিভিন্ন সূত্র। এসব বৈঠকে মামলার পরিবর্তে আপস-মীমাংসার আলোচনা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, বিষয়টি নিয়ে আর্থিক সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। যদিও এসব দাবির পক্ষে আনুষ্ঠানিক কোনো নথি পাওয়া যায়নি, তবুও একই ধরনের তথ্য একাধিক সূত্র থেকে উঠে আসায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে।

এদিকে নেহালপুর পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ অলক বিশ্বাস জানিয়েছেন, ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে জন্মনিবন্ধন সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে তারা আর যোগাযোগ করেনি। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা চলছে বলেও তিনি শুনেছেন বলে জানান।

তবে এখানেই দেখা দিয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যদি একটি কিশোরী অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগ করে থাকে, তাহলে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই, সাক্ষ্য সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং অন্যান্য অনুসন্ধানমূলক কার্যক্রম কতটুকু সম্পন্ন হয়েছে? অভিযোগকারী পরিবার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে বিলম্ব করলেও অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় তদন্ত কতদূর অগ্রসর হয়েছে, সেই বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী কিশোরী জানান, “আমি অভিযোগ দেওয়ার পরেও পুলিশের পক্ষ থেকে আমাদের কোনো সহায়তা বা কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। স্থানীয় মাতব্বররা আমাদের হুমকি দিচ্ছে।”

এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী কিশোরীর মা জানান, “অভিযোগ করার পর স্থানীয় নেতারা আমাদের অভিযোগ তুলে আনতে অনেক চাপ সৃষ্টি করছে। আমরা গরিব-অসহায় মানুষ। ভয়ে বাড়ি থেকে বের হতে পারছি না।”

এ ব্যাপারে মণিরামপুর থানার অফিসার ইনচার্জ আবু সাইদ বলেন, “আদৌ ওই রকম ঘটনা ঘটেছে কি না, আমার জানা নেই। অভিযোগ পেয়ে তদন্ত করে ওই ঘটনার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।”

এ বিষয়ে যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। অভিযোগের কপিটা আমাকে একটু দেন। আমি মণিরামপুর থানার ওসির সঙ্গে কথা বলতেছি।”

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অভিযোগটি সত্য হলে এটি একটি জঘন্য অপরাধ এবং দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়া প্রয়োজন। আবার অভিযোগটি অসত্য হলে সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটন করা জরুরি। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তা বজায় থাকায় প্রকৃত সত্য উদঘাটনের চেয়ে গুঞ্জন ও সন্দেহই বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

আইন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ কিংবা ধর্ষণের মতো অভিযোগ সামাজিক সালিশ বা আর্থিক সমঝোতার বিষয় নয়। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত পথ। ফলে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব যেমন তদন্ত সংস্থার, তেমনি অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার কোনো চেষ্টা হয়ে থাকলে সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

বর্তমানে মনোহরপুরবাসীর মুখে একটি প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে, একটি কিশোরীর লিখিত অভিযোগ, সাক্ষীর উল্লেখ, অপহরণ ও ধর্ষণের দাবি এবং পরবর্তী রহস্যজনক নীরবতার পেছনে প্রকৃত সত্য কী? অভিযোগটি কি আইনের স্বাভাবিক গতিতে তদন্তের দিকে এগোচ্ছে, নাকি অদৃশ্য কোনো প্রভাবের কারণে বিচারিক প্রক্রিয়া শ্লথ হয়ে পড়েছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই এখন জানতে চায় পুরো এলাকা।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা