লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুতিদের হামলা থেকে জাহাজ রক্ষার জন্য সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব। এতে আরও ১৩টি দেশ যোগ দিয়েছে বলে জানিয়েছে রিয়াদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে বাংলাদেশও আছে।
সৌদি আরবের এই ঘোষণা এলো পৃথক দুটি ঘটনার পর। প্রথমত, হরমুজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দেশটি লোহিত সাগরের বাব এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানির কার্যক্রম শুরু করেছিল। কিন্তু হুতিরা সৌদির বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপের পর সে চেষ্টা ব্যাহত হয়। দ্বিতীয়ত, হুতিরা এখন প্রণালি দিয়ে চলাচল করা জাহাজ থেকে ফি আদায়ের পরিকল্পনা করছে বলে খবর বেরিয়েছে।
এ অবস্থায় লোহিত সাগরে জাহাজ পাহারা দেওয়ার জন্য জোট গঠনের ঘোষণা দিল সৌদি। এর সদরদপ্তর হবে রিয়াদে।
জোটে কারা যোগ দিয়েছে?
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব ছাড়াও বাংলাদেশ, তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিশর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও পূর্ব আফ্রিকার দেশ কোমোরোস জোটের সদস্য হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমান যোগ দেয়নি। আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রও যোগ দেওয়ার বিষয়ে কিছু জানায়নি। তবে তাদের যোগ দেওয়ার কথা আছে।
জোট গঠন সংক্রান্ত বৈঠকে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা। বৃহস্পতিবার রিয়াদে। ছবি: সৌদির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়
জোট গঠন সংক্রান্ত বৈঠকে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা। বৃহস্পতিবার রিয়াদে। ছবি: সৌদির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়
প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য দেশগুলোর পক্ষে সৌদির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এর বরাত দিয়ে দেশটির স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে বলা হয়েছে, জোট প্রতিষ্ঠার জন্য আমন্ত্রিত ৫১টি দেশের মধ্যে ৪৩টি দেশের প্রতিনিধিরা বৃহস্পতিবার একটি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলও ছিল।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এক্সে ওই বৈঠকের একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে সৌদির গণমাধ্যম আল আরাবিয়া। এতে দেখা গেছে, উপস্থিত প্রতিনিধিরা সবাই সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা।
বাংলাদেশের অবস্থান কী?
জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণার তথ্য জানা যায়নি। তবে যৌথ বিবৃতির বরাত দিয়ে সৌদি আরবের গণমাধ্যম সৌদি গেজেট জানিয়েছে, অংশগ্রহণকারী দেশগুলো জোটের সনদে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদানের জন্য তাদের অভ্যন্তরীণ আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে।
এর আগে লোহিত সাগরের পরিস্থিতি প্রসঙ্গে গত ২২ জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্টে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়েছে, ‘সরকার সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিদের নৌ অবরোধের ঘোষণার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। বাংলাদেশ মনে করে, এ ধরনের পদক্ষেপ উত্তেজনা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা ক্ষুন্ন এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্য ব্যাহতের ঝুঁকি তৈরি করে।’
ওই বিজ্ঞপ্তিতে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক রুটে নিরবিচ্ছিন্ন নৌ চলাচলের প্রতি সমর্থনও ব্যক্ত করা হয়। বলা হয়, ‘লোহিত সাগর বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এখানে যেকোনো ধরনের ব্যাঘাত সারা বিশ্বের মানুষের জন্য গুরুতর অর্থনৈতিক পরিণতি ডেকে আনবে। তাই বাংলাদেশ সব নাবিক ও পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছে।’
বাংলাদেশের ভূমিকা কেমন হবে?
সদস্যদের পক্ষে সৌদি আরব যে বিবৃতি প্রকাশ করেছে, সেখানে একক কোনো দেশের ভূমিকার কথা আলাদা করে উল্লেখ নেই। বলা হয়েছে, যৌথ বিবৃতির বক্তব্যের বিষয়ে অংশগ্রহণকারীরা একমত।
যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, সদস্যরা জোটের সনদ অনুযায়ী সামুদ্রিক নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, অপারেশনাল পরিকল্পনা, যৌথ মহড়া, প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিক্ষা এবং যৌথ সামুদ্রিক অভিযানে সহযোগিতা সম্প্রসারণ করবে।
বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, জোটটি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক। এটি কোনো দেশ, জোট বা আন্তর্জাতিক সংস্থার বিরুদ্ধে নয়।
জোটটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল রক্ষা এবং অভিন্ন সামুদ্রিক স্বার্থ রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়ম অনুযায়ী কাজ করবে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলো জোটের যৌথ কমান্ড, কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সেন্টার, যৌথ সামুদ্রিক অপারেশন সেন্টার এবং প্রধান নির্বাহী সংস্থা হিসেবে সৌদি আরবে সাধারণ সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় সম্মত হয়েছে।
হুতি বিদ্রোহীরা কী বলছে?
বৃহস্পতিবার জোটের ঘোষণা আসার কয়েক ঘণ্টা আগে হুতির পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছিল। ইউরো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুতি নেতা আবদুল মালিক আল-হুতি সৌদি আরবকে উদ্দেশ্য করে ‘সর্বাত্মক প্রতিক্রিয়ার’ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
লোহিত সাগরের সৈকতে হুতির এক সদস্য। পেছনে ভাসমান জাহাজ। ফাইল ছবি: ইপিএ
লোহিত সাগরের সৈকতে হুতির এক সদস্য। পেছনে ভাসমান জাহাজ। ফাইল ছবি: ইপিএ
আবদুল মালিক আল-হুতি বলেন, ‘কিছু ইঙ্গিত বলছে, সৌদি আরব পূর্ণাঙ্গ উত্তেজনার দিকে এগোচ্ছে। আমরা পূর্ণাঙ্গ উত্তেজনার মাধ্যমেই এর পাল্টা জবাব দেব।’ ইয়েমেনকে সৌদি আরব ইচ্ছাকৃতভাবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের চক্রে আটকে রেখেছে বলে অভিযোগ করেন আবদুল মালিক। তিনি বলেন, ‘২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করার পর থেকেই মার্কিন-সৌদি আগ্রাসন চলমান।’
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরব ও পশ্চিমা দেশ সমর্থিত ইয়েমেনের তৎকালীন সরকারের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায় হুতিরা। এতে অন্তত ৮ হাজার ৬০০ মানুষ প্রাণ হারায়। ওই সংঘাত ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ নামেও পরিচিত। এরপর বিভিন্ন সময় সৌদির তেলবাহী নৌযান লক্ষ্য করে লোহিত সাগরে হামলা হয়েছে।
লোহিত সাগর কেন গুরুত্বপূর্ণ?
লোহিত সাগরের একপাশে সৌদি আরব ও ইয়েমেন এবং অন্যপাশে মিশর, সুদান, ইরিত্রিয়া, জিবুতি ও সোমালিয়া অবস্থিত। জাহাজ চলাচলের জন্য এটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোর একটি। এ পথে বৈশ্বিক প্রায় ৩০ শতাংশ পণ্য পরিবহন করা হয়।
বাব এল-মান্দেব প্রণালির কারণেও লোহিত সাগর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই সংকীর্ণ জলপথ লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর বন্দরে তেল পরিবহনের জাহাজ প্রবেশ ও প্রস্থানের ধমনি বলা হয় এই প্রণালিকে। আরেকটি ধমনি হলো মিসরের সুয়েজ খাল।
লোহিত সাগরে টহলরত ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনীর এক সদস্য। ছবি: এএফপি
লোহিত সাগরে টহলরত ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনীর এক সদস্য। ছবি: এএফপি
আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশটি ২৯ কিলোমটির চওড়া। সেখানে জাহাজ চলাচলের দুটি চ্যানেল আছে। ২০২৪ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, এই পথ দিয়ে সে বছর ৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহন করা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে হরমুজ প্রণালি স্থবির হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব তাদের তেল রপ্তানির বেশিরভাগ কার্যক্রম ইয়ানবু বন্দরে স্থানান্তর করে। এই বন্দরটি লোহিত সাগরের তীরে। সম্প্রতি হুতিদের হামলার কারণে রিয়াদের পক্ষে লোহিত সাগর ব্যবহার করা কঠিন হয়ে গেছে।
হুতিরা জাহাজ ফি নেবে?
সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্স টোল আদায় সংক্রান্ত একটি খবর প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, লোহিত সাগর ও বাব এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে চলা জাহাজ থেকে ফি আদায়ের পরিকল্পনা করছে হুতিরা। গত বুধবার ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের তথ্যমন্ত্রী মোয়াম্মার আল-রিয়ানি জানান, ইরানের পরামর্শে হুতিরা এই পরিকল্পনা সাজাচ্ছে।
মোয়াম্মার আল-রিয়ানির মতে, এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক উসকানি হতে যাচ্ছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলে বিশ্বের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তহবিলের উৎসে পরিণত হবে। রয়টার্স ওই প্রতিবেদন লেখার সময় হুতিদের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পায়নি।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, হরমুজ ও বাব এল-মান্দেবের মতো প্রাকৃতিক প্রণালি থেকে সীমান্তবর্তী দেশগুলো টোল আদায় করতে পারে না। কোনো প্রণালি সম্পূর্ণভাবে আঞ্চলিক জলসীমার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হলেও টোল আদায় করা যাবে না। তবে কিছু ক্ষেত্রে ‘সার্ভিস ফি’ নেওয়ার অনুমতি আছে। যেমন- নোঙর করা ও বীমা।