আফগানিস্তানের পূর্ব সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তান বিমান বাহিনীর চালানো ‘ডাবল-ট্যাপ’ বোমাবর্ষণে শিশু ও বৃদ্ধসহ অন্তত ৩৫ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। অভিযানে কেবল সশস্ত্র যোদ্ধাদের হত্যার দাবি করা হলেও আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকার একে এক বর্বর আগ্রাসন ও যুদ্ধাপরাধ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
সামরিক পরিভাষায় ডাবল-ট্যাপ বলতে কোনো একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে প্রথমবার বোমা ফেলার ঠিক অল্প সময় পর আবারও সেখানে দ্বিতীয় দফায় সুপরিকল্পিতভাবে আক্রমণ করাকে বোঝায়।
রোববার (২৮ জুন) দিবাগত রাত সাড়ে বারোটার দিকে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানগুলো আফগানিস্তানের পাক্তিকার গায়ান, পাক্তিয়ার চামকানি এবং কুনারের মারাওয়ারা জেলার বিভিন্ন আবাসিক বাড়ি ও মসজিদের ওপর প্রথম দফার বোমাবর্ষণ শুরু করে।
এর ঠিক ২৫ মিনিট পর যখন স্থানীয় সাধারণ গ্রামবাসীরা ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে চাপা পড়া চিৎকাররত নারী ও শিশুদের উদ্ধার করতে ছুটে আসেন, ঠিক তখনই পাকিস্তানি বিমানগুলো ফিরে এসে ওই নিরস্ত্র উদ্ধারকারীদের ওপর দ্বিতীয় দফায় বোমা ফেলে। এই দ্বিতীয় দফার উদ্দেশ্যমূলক হামলার কারণেই নিহতের সংখ্যা দ্রুত ৩৫ পার হয়ে যায় এবং হাসপাতালে শতাধিক আশঙ্কাজনক রক্তাক্ত মানুষ ভর্তি হন।
আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের কেন্দ্রীয় মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ এই বিমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে এক ‘কাপুরুষোচিত আগ্রাসন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে, ‘আমরা এই কাপুরুষোচিত আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানাই এবং এটিকে একটি অপরাধ ও বর্বরতার কাজ বলে মনে করি।’
তালেবান কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী এই হামলায় ৪ থেকে ৯ বছর বয়সী বেশ কিছু শিশু ও বয়োবৃদ্ধ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। হাসপাতালের ভিডিও ফুটেজেও রক্তাক্ত শিশুদের স্ট্রেচারে শুয়ে থাকতে দেখা গেছে এবং চামকানি অঞ্চলের এক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন যে সেখানে কোনো সন্ত্রাসী ছিল না, কেবল সাধারণ মানুষই পাকিস্তানি বোমার শিকার হয়েছেন।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে অবশ্য দাবি করেছেন যে দেশের অভ্যন্তরে খাইবার পাখতুনখোয়া, বেলুচিস্তান এবং করাচির রেঞ্জার্স ক্যাম্পে সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলার জবাব দিতেই এই গোয়েন্দাভিত্তিক স্থল ও নিখুঁত বিমান অভিযান চালানো হয়েছে।
তার মতে এই বিশেষ অভিযানে নিষিদ্ধ সংগঠন জামাত-উল-আহরার এবং ‘ফিতনা আল খওয়ারিজ’-এর আস্তানাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে ২৯ জন উগ্রবাদীকে খতম করা হয়েছে। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে টিটিপি যোদ্ধারা আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানের মাটিতে বছরের পর বছর ধরে নাশকতা চালাচ্ছে, যদিও কাবুল সরকার এই আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ বরাবরই পুরোপুরি অস্বীকার করে আসছে।
আফগান সীমান্তে মুহুর্মুহু হামলা পাকিস্তানের, নিহত ২৯আফগান সীমান্তে মুহুর্মুহু হামলা পাকিস্তানের, নিহত ২৯
পাকিস্তানের এই সাম্প্রতিক সামরিক হামলার পাশাপাশি দেশটির অভ্যন্তরে আরও তিনটি বড় রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ সংকট তৈরি হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। প্রথমত করাচিতে গত সপ্তাহে রেঞ্জার্স দপ্তরে হামলার পর পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি এই ঘটনার পেছনে ‘ভারতীয় প্রক্সি’ জড়িত থাকার দাবি করেছিলেন, যা নয়া দিল্লি সম্পূর্ণ ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
দ্বিতীয়ত বেলুচিস্তানের একটি সন্ত্রাসবিরোধী আদালত প্রখ্যাত মানবাধিকার কর্মী মাহরাং বালোচকে ২০২৪ সালের এক বিক্ষোভের সময় আধাসামরিক সেনা নিহতের ঘটনায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছে, যাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও কণ্ঠরোধের চেষ্টা বলে নিন্দা জানিয়েছে। তৃতীয়ত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে দেশটির অন্যতম বৃহৎ টেলিভিশন নেটওয়ার্ক জিও নিউজকে সাময়িকভাবে সম্প্রচার বন্ধ বা অফ-এয়ার করে দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি