April 14, 2026, 11:52 pm

ফুলে ফুলে প্রাণের জাগরণ ডিসি পার্কে রঙ গন্ধ আর বিভিন্ন উৎসবের মহাসমারোহে চট্টগ্রাম ফৌজদারহাটে ফুলের রাজ্যে

এস এম জহিরুল ইসলাম বিদ্যুৎ :জলাধারের চারপাশে লাল সাদা হলুদ নীল বেগুনি গোলাপি কমলা রঙের ফুল দুলছে পৌষের হিমেল বাতাসে। ফুলের রং আর সৌরভে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটের ডিসি পার্ক।কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় যেন বলা যায় ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত জেগেছে প্রাণে।প্রকৃতির এই অপরূপ সাজে ডিসি পার্ক এখন শুধু একটি পার্ক নয় এটি হয়ে উঠেছে সৌন্দর্যের কবিতা রঙের গান আর মানুষের মিলনমেলা।

শুক্রবার ৯ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী চট্টগ্রাম ফুল উৎসব ২০২৬।এটি ডিসি পার্কে আয়োজিত চতুর্থ ফুল উৎসব যা চলবে আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত।সকালে উৎসবের উদ্বোধন করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. এহছানুল হক। উদ্বোধনী মুহূর্তেই ফুলে ফুলে রাঙা ডিসি পার্ক যেন নজরুলের বিদ্রোহী কণ্ঠ ছেড়ে দিয়ে হয়ে উঠেছে শান্ত সৌন্দর্যের মঞ্চ।

মাসব্যাপী এই উৎসবে দেশি বিদেশি প্রায় ১৪০ প্রজাতির লক্ষাধিক ফুলের সমারোহ ঘটেছে।গোলাপ লাল গোলাপ সাদা গোলাপ পিঙ্ক গোলাপ বাটন রোজ গাঁদা ইয়েলো মেরিগোল্ড অরেঞ্জ মেরিগোল্ড চন্দ্রমল্লিকা জিনিয়া ডালিয়া সূর্যমুখী কসমস পেটুনিয়া ফ্লক্স স্যালভিয়া লোবেলিয়া জারবেরা ডেইজি গ্লাডিওলাস কার্নেশন টিউলিপ লিলি আইরিস অর্কিড বেগোনিয়া ক্যালেন্ডুলা ভারবেনা অ্যালিসাম প্যানসি কোলিয়াস সেলোসিয়া ব্রোমেলিয়া ফিউশিয়া ক্যালাডিয়াম হিবিস্কাস বোগেনভেলিয়া নাইট কুইন রজনীগন্ধা শিউলি কদম কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়া কাঞ্চন মালতী মাধবীলতা বেলি জুঁই হাসনাহেনা অপরাজিতা নয়নতারা ফক্সটেল ডালিয়া পপি ব্লু স্যালভিয়া রেড স্যালভিয়া ইয়েলো কসমস পার্পল ফ্লক্স সহ আরও অসংখ্য বাহারি ফুলে ভরে উঠেছে পার্কের প্রতিটি কর্নার।

ফুল দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে নানা আকারের ভাস্কর্য ফুলের দেয়াল ফুলের হৃদয় ফুলের ছাতা ফুলের বৃক্ষ।থিম গার্ডেন আর নান্দনিক ল্যান্ডস্কেপে সাজানো পার্ক যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস যেখানে প্রকৃতি নিজেই শিল্পী।

পার্কজুড়ে হাঁটার পথের দুই পাশে সারি সারি ফুল দর্শনার্থীদের নিয়ে যাচ্ছে এক রঙিন স্বপ্নের পথে।প্রতিটি মোড়ে রয়েছে ছবি তোলার জন্য আলাদা স্পট।তরুণ তরুণী পরিবার শিশু বৃদ্ধ সবাই এখানে এসে ক্যামেরাবন্দি করছে আনন্দের মুহূর্ত।নতুন আকর্ষণ হিসেবে যুক্ত হয়েছে জিপ লাইন ক্লাইম্বিং ট্রি ট্রি হার্ট বিগ ফ্লাওয়ার ট্রি আমব্রেলা ট্রি ফ্লাওয়ার টি যা বিশেষ করে তরুণদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে। ফুল দেখা আর বিনোদন একসাথে মিলিয়ে ডিসি পার্ক এখন হয়ে উঠেছে পূর্ণাঙ্গ পারিবারিক আনন্দকেন্দ্র।

ফুল উৎসবকে ঘিরে মাসব্যাপী রয়েছে প্রতিদিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।মঞ্চে ভেসে আসছে গান কবিতা নৃত্য আর নাটকের সুর। মাল্টিকালচারাল ফেস্টিভ্যাল গ্রামীণ মেলা বই উৎসব ঘুড়ি উৎসব ফুলের সাজে একদিন পিঠা উৎসব লেজার লাইট শো ভিআর গেইম ভায়োলিন শো মুভি শো পুতুল নাচসহ নানা আয়োজন দর্শনার্থীদের সময়কে করে তুলছে আরও আনন্দময়।

শিশুদের কোলাহল তরুণদের হাসি আর বয়স্কদের প্রশান্ত মুখ সব মিলিয়ে ডিসি পার্ক যেন সমাজের সব বয়সের মানুষের মিলনভূমি।এছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬ এর প্রচারণার জন্য রাখা হয়েছে একটি বিশেষ স্টল যেখানে নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ডিসি পার্কের ভৌগোলিক অবস্থানও উৎসবের আকর্ষণ বাড়িয়েছে বহুগুণ।ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাথে সংযুক্ত বন্দর ফৌজদারহাট টোল রোড ঝাউগাছ আর জলাশয়ের পাশ দিয়ে যাওয়া এই সড়ক মেরিন ড্রাইভ হয়ে যুক্ত হয়েছে আউটার রিং রোডের সাথে।সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে প্রতিদিন চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দর্শনার্থীরা আসছেন।

সীতাকুণ্ড উপজেলার উত্তর ছলিমপুর মৌজার বালুচর শ্রেণির এই জায়গাটি একসময় দখলে নিয়ে গড়ে উঠেছিল শুকতারা নামের একটি পর্যটন কেন্দ্র ও রেস্টুরেন্ট।২০২২ সালে জেলা প্রশাসন দখলদার উচ্ছেদ করে জনস্বার্থে এই জায়গাকে পার্কে রূপান্তর করে নাম দেয় ডিসি পার্ক। এরপর থেকেই পরিকল্পিত উন্নয়ন আর নান্দনিক সৌন্দর্যের মাধ্যমে এটি হয়ে ওঠে চট্টগ্রামের অন্যতম পরিচিত বিনোদন কেন্দ্র।

পরের বছর থেকে শুরু হওয়া ফুল উৎসব অল্প সময়ের মধ্যেই চট্টগ্রামবাসীর হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।এখন এই উৎসব শুধু নগরের নয় এটি একটি জাতীয় আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।আজ ডিসি পার্ক যেন নজরুলের কণ্ঠে ঘোষণা করছে মানবের চেয়ে বড় কিছু নাই প্রকৃতির মাঝে দাঁড়িয়ে মানুষই আসল সৌন্দর্য।রঙিন ফুলের মাঝে মানুষ প্রকৃতির কাছে ফিরে এসে খুঁজে পাচ্ছে প্রশান্তি ভালোবাসা আর জীবনের নতুন শক্তি।ডিসি পার্কের ফুল উৎসব তাই শুধু ফুলের প্রদর্শনী নয় এটি মানুষের মননে আনন্দের এক দীপ্ত ঘোষণা।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা