October 22, 2026, 2:57 am

২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনে বাস্তুচ্যুত হতে পারে বাংলাদেশের ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সুপেয় পানির সংকট ও কৃষি খাতে বিপর্যয়ের কারণে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হতে পারে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক প্রতিবেদনে এ আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে।

‘এশিয়া-প্যাসিফিক ক্লাইমেট রিপোর্ট ২০২৬: কোস্টাল রিস্ক অন দ্য রাইজ—অ্যাকশনস ফর আ রেজিলিয়েন্ট ফিউচার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রিনহাউস গ্যাসের উচ্চ নির্গমন অব্যাহত থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ১ কোটি ৭৫ লাখ মানুষ উপকূলীয় প্লাবনের শিকার হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্লাবন-ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর বসবাস। বিশেষ করে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপসহ ঘনবসতিপূর্ণ নদী অববাহিকাগুলোতে এই ঝুঁকি বেশি। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মতো উন্নয়নশীল দেশে উপকূলীয় বন্যায় দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে তাদের দারিদ্র্য ও বঞ্চনার চক্র আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্বব্যাপী উপকূলীয় বন্যার ঝুঁকিও দ্রুত বাড়ছে। এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রতি বছর ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ উপকূলীয় বন্যায় আক্রান্ত হতে পারে। ২১০০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১০ কোটি ৮০ লাখে।

বাড়তে পারে আর্থিক ক্ষতি

প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, যথাযথ অভিযোজন ও সুরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উপকূলীয় বন্যার বার্ষিক ক্ষয়ক্ষতি ২০৫০ সালের মধ্যে বর্তমানের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ এবং ২১০০ সাল নাগাদ প্রায় ২০ গুণ বাড়তে পারে।

এ অঞ্চলের ৩০টি উপকূলীয় অর্থনীতির ওপর পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, বর্তমানে উপকূলীয় প্লাবনে বছরে প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না হলে ২০৫০ সালে এ ক্ষতি বেড়ে ১৭২ বিলিয়ন থেকে ১৯৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ২১০০ সাল নাগাদ তা ৫২০ বিলিয়ন থেকে ৭৩৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এডিবির হিসাবে, বন্যাজনিত ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিবছর উপকূলীয় সুরক্ষায় ৯ বিলিয়ন থেকে ১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে বছরে ১৭৮ বিলিয়ন থেকে ৩৬০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। অর্থাৎ, উপকূলীয় সুরক্ষায় সময়মতো বিনিয়োগ করলে ব্যয়ের তুলনায় সর্বোচ্চ ২০ গুণ পর্যন্ত সুফল পাওয়া যেতে পারে।

প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি

জলবায়ু ঝুঁকির পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের উদ্যোগেরও প্রশংসা করেছে এডিবি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগাম সতর্কবার্তা ও দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদার করতে বাংলাদেশে দেশজুড়ে বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্র উপকূলীয় এলাকায় দুর্যোগের সময় মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তবে ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজন পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন, ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার এবং জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।

এডিবির ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট বিভাগের মহাপরিচালক ইয়েভগেনি জুকোভ বলেন, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে উপকূলীয় এলাকাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও তীব্র প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এসব এলাকার ভূখণ্ড ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে। মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে দীর্ঘমেয়াদি, অভিযোজনযোগ্য ও ঝুঁকিসহিষ্ণু সমাধান গ্রহণ জরুরি।

উপকূলীয় শহর ও অর্থনীতিও ঝুঁকিতে

এডিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংস্থাটির সদস্য দেশগুলোর ৪০ কোটিরও বেশি মানুষ সমুদ্র উপকূল থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করে। এসব এলাকা জনবসতির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর, বাণিজ্যিক কেন্দ্র, পর্যটনস্থান ও বিশ্ব ঐতিহ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যাংকক, জাকার্তা, কলকাতা ও মুম্বাইয়ের মতো বড় শহরগুলো উপকূলীয় বন্যার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ঐতিহাসিক তথ্যের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব শহরে যে ধরনের ভয়াবহ উপকূলীয় বন্যা আগে ১০০ বছরে একবার ঘটত, তা এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ প্রতিবছর ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য ও অন্যান্য কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় প্রতিবছর ৪০ বিলিয়ন থেকে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ বা বাণিজ্য ঝুঁকিতে রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উচ্চ কার্বন নিঃসরণের পরিস্থিতিতে ২১০০ সাল নাগাদ ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর বার্ষিক বন্যাজনিত ক্ষতি তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে এডিবি। সংস্থাটির মতে, উপকূলীয় সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা