September 9, 2026, 3:33 am

৫৫ বছরেও নিরক্ষরমুক্ত হয়নি বাংলাদেশ, অক্ষরজ্ঞানহীন ৩ কোটি ৬৩ লাখ

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো অক্ষরজ্ঞান থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ২২ দশমিক ১ শতাংশ এখনো নিরক্ষর। দেশের ১৭ কোটি ২২ লাখ ৮০ হাজার মানুষের হিসাবে এই সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬৩ লাখ।

আজ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’। দিবসটি সামনে রেখে সরকার বলছে, দেশে সাক্ষরতার হার বাড়লেও এখনো বড় একটি জনগোষ্ঠী শিক্ষা ও দক্ষতার সুযোগ থেকে বাইরে রয়েছে।

গতকাল সোমবার সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ সাক্ষরতা বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের সাক্ষরতার হার ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে।

দারিদ্র্য কমেছে, বেড়েছে সাক্ষরতার হার

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে কমেছে দারিদ্র্যের হার। ১৯৭১ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৮০ শতাংশের বেশি, আর সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে।

অর্থাৎ গত ৫৫ বছরে দারিদ্র্যের হার কমেছে প্রায় ৫৮ শতাংশ। বিপরীতে সাক্ষরতার হার বেড়েছে ৬১ দশমিক ১ শতাংশ। তবে দারিদ্র্য কমলেও শতভাগ সাক্ষরতা অর্জনের পথে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

অক্ষরজ্ঞান না থাকায় কর্মক্ষেত্রে বাড়ছে ভোগান্তি

সাক্ষরতার অভাবে দেশের অনেক মানুষ প্রতিনিয়ত নানা ধরনের হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এমনকি দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও শুধু পড়তে ও লিখতে না জানার কারণে অনেকে কাঙ্ক্ষিত কাজ বা বেতন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের বাসিন্দা আজিজুল হকের ঘটনাটি এর একটি উদাহরণ। দীর্ঘদিন ধরে ট্রাক চালানোর পাশাপাশি গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা থাকলেও লেখাপড়া না জানায় তিনি ড্রাইভিং লাইসেন্সের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারছেন না। শেষ পর্যন্ত লাইসেন্স পেতে তাকে ১৪ হাজার টাকা দিয়ে দালালের আশ্রয় নিতে হয়েছে বলে জানান তিনি।

শুধু দেশেই নয়, প্রতিবছর অক্ষরজ্ঞানহীন অনেক শ্রমিক কাজের জন্য বিদেশে যাচ্ছেন। প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরও অক্ষরজ্ঞান না থাকায় তাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা তুলনামূলক কম মজুরিও পাচ্ছেন।

ঝরে পড়া শিক্ষার্থীও বড় চ্যালেঞ্জ

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বর্তমানে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশু-কিশোর, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং শিক্ষা থেকে বঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষকে সাক্ষরতার আওতায় আনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বলেন, এখনো একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা ও দক্ষতার সুযোগের বাইরে রয়েছে। তাদের কাছে শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার অন্যতম শর্ত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাক্ষরতার হার নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যানে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সাক্ষরতার সংজ্ঞার সঙ্গে দেশের প্রচলিত কার্যক্রমেরও পুরোপুরি সামঞ্জস্য নেই। ফলে দেশকে পুরোপুরি নিরক্ষরমুক্ত করার লক্ষ্য অর্জন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

৫ হাজারের বেশি তরুণকে দেওয়া হচ্ছে প্রশিক্ষণ

দেশের ৬৪ জেলার সদর উপজেলায় ‘কার্যকর সাক্ষরতা ও ব্যবহারিক কর্মদক্ষতা প্রশিক্ষণ’ কার্যক্রম চালু করেছে সরকার। প্রথম ধাপে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়া ৫ হাজার ১২০ জন কিশোর-কিশোরীকে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে।

প্রতিটি কোর্সে ৪৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ১০০ ঘণ্টা কার্যকর সাক্ষরতা এবং ৩৬০ ঘণ্টা দক্ষতা প্রশিক্ষণ রয়েছে। প্রশিক্ষণ বাংলাদেশ জাতীয় যোগ্যতা কাঠামোর (বিএনকিউএফ) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত হচ্ছে।

সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ কার্যক্রমের আওতায় নিবন্ধিত ৪ হাজার ৩১২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪ হাজার ১৯৮ জন সক্ষম হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩ হাজার ৮৮২ জন, অর্থাৎ ৯২ দশমিক ৪৭ শতাংশ কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

সাক্ষরতার ধারণায় যুক্ত হচ্ছে প্রযুক্তি ও জীবনদক্ষতা

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সাক্ষরতা শুধু পড়া, লেখা ও গণনার দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জীবনদক্ষতা, তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, বিশ্লেষণমূলক চিন্তা, নৈতিক মূল্যবোধ ও পরিবেশ সচেতনতাও যুক্ত।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে সাক্ষরতার অর্থ শুধু পড়া, লেখা ও গণনার সক্ষমতা নয়। এর সঙ্গে ডিজিটাল দক্ষতা, তথ্য ব্যবহারের সক্ষমতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা, জীবনদক্ষতা ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের লক্ষ্য এখন শুধু মানুষকে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন করা নয়, বরং দক্ষতা ও কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে তাদের আত্মনির্ভর করে তোলা। তবে প্রায় ৩ কোটি ৬৩ লাখ মানুষের নিরক্ষরতা দূর করতে দারিদ্র্য, ঝরে পড়া এবং শিক্ষার সুযোগের অসমতা দূর করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা