August 12, 2026, 5:25 pm

বিদ্যুতের নীরব শত্রু: অবৈধ চার্জিং, নিয়ন্ত্রণহীন ইজিবাইক ও জবাবদিহিতার সংকট-তার লম্বা নয়, জনগণের ধৈর্যের সীমাই শেষ হয়ে আসছে

বাংলাদেশের উন্নয়ন, শিল্পায়ন, কৃষি উৎপাদন এবং নাগরিক জীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি বিদ্যুৎ। একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অন্যতম সূচক হলো তার নিরবচ্ছিন্ন ও সুশাসিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। গত এক দশকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে বিদ্যুতের সংযোগ পৌঁছেছে, ডিজিটাল সেবা বিস্তৃত হয়েছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতেও নতুন গতি এসেছে। কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির এই সাফল্যের আড়ালে একটি কঠিন বাস্তবতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে—বিদ্যুতের সুশাসন, সঠিক ব্যবহার এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়নি।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লোডশেডিং, ভোল্টেজের ওঠানামা এবং সরবরাহ ঘাটতির অভিযোগ নিয়মিত শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় দিনের পর দিন মানুষ বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। কৃষকরা সেচ কার্যক্রমে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন, ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন ও সেবায় ক্ষতির মুখে পড়ছে এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। বাস্তবতা হলো, বিদ্যুতের চাহিদা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে এর ওপর অনিয়ন্ত্রিত চাপ এবং অপব্যবহার।
এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে এমন কিছু বক্তব্য এসেছে, যা জনমনে বিস্ময় ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। যখন বলা হয়, “গ্রামে কোথাও লোডশেডিং নেই, বিদ্যুতের তার লম্বা হওয়ায় বিদ্যুৎ পৌঁছাতে দেরি হয়”, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এ বক্তব্য কি বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন, নাকি জনগণের দুর্ভোগকে অস্বীকার করার একটি অযৌক্তিক চেষ্টা?
গ্রামবাংলার মানুষ প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং সহ্য করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গণমাধ্যম এবং স্থানীয় প্রশাসনের নিকট প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অসংখ্য অভিযোগ জমা পড়ছে। বাস্তবতার সঙ্গে জনগণের অভিজ্ঞতার যখন এত বড় ব্যবধান দেখা যায়, তখন এমন বক্তব্য শুধু প্রশ্নবিদ্ধই হয় না, বরং জনগণের কষ্টকে উপেক্ষা করার একটি প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়।
প্রকৃতপক্ষে দেশের বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম আলোচিত কারণ হয়ে উঠেছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বৃদ্ধি পাওয়া ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, অটোরিকশা, অটোভ্যান এবং অনুরূপ যানবাহনের চার্জিং ব্যবস্থা। পরিবেশবান্ধব ও স্বল্পব্যয়ী পরিবহন হিসেবে এসব যানবাহনের ইতিবাচক ভূমিকা থাকলেও বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে এগুলোর একটি বড় অংশ কার্যত কোনো কার্যকর নীতিমালার আওতায় নেই।
দেশের বিভিন্ন শহর, উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলে লক্ষাধিক ব্যাটারিচালিত যানবাহন প্রতিদিন চার্জ হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব চার্জিং পরিচালিত হচ্ছে আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে। একটি পরিবারে গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত সংযোগে যখন প্রতিদিন একাধিক ব্যাটারি চার্জ করা হয়, তখন স্থানীয় সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। বহু এলাকায় রাতভর ইজিবাইক ও অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার কারণে ট্রান্সফরমার অতিরিক্ত লোড বহন করতে বাধ্য হচ্ছে।
এর সঙ্গে আরও যুক্ত হয়েছে অবৈধ সংযোগ, হুকিং এবং মিটার বাইপাসের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। বিভিন্ন এলাকায় অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদিত মিটারের বাইরে গিয়ে সরাসরি লাইন থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ চুরি শুধু একটি আইনি অপরাধ নয়; এটি জাতীয় সম্পদের বিরুদ্ধে সংগঠিত অর্থনৈতিক অপরাধ। এর ফলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়, সঞ্চালন ব্যবস্থার ক্ষতি হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষতির বোঝা বহন করতে হয় সাধারণ গ্রাহকদের।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। একজন সাধারণ গ্রাহক তার ঘরের আলো, ফ্যান, টেলিভিশন কিংবা দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করছেন। কিন্তু একই আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করে যদি কেউ প্রতিদিন একাধিক বাণিজ্যিক যানবাহন চার্জ দিয়ে অর্থ উপার্জন করেন, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে বাণিজ্যিক কার্যক্রম। সেক্ষেত্রে বাণিজ্যিক সংযোগ গ্রহণ এবং সেই অনুযায়ী বিল পরিশোধ করাই হওয়া উচিত ন্যায্য ও আইনসম্মত ব্যবস্থা।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে যেখানে প্রকৃত সমস্যার সমাধানের চেয়ে অনেক সময় ব্যাখ্যা ও অজুহাতের চর্চাই বেশি দৃশ্যমান হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, বিদ্যুৎ সংকট কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি। উৎপাদন ঘাটতি, জ্বালানি সংকট, সঞ্চালন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তিগত ক্ষয়ক্ষতি, অবৈধ ব্যবহার, বিদ্যুৎ চুরি এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা—সবকিছু মিলিয়েই বর্তমান পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।
এই সংকট মোকাবিলায় প্রথমত দেশব্যাপী ব্যাটারিচালিত যানবাহনের একটি সমন্বিত জরিপ পরিচালনা করা প্রয়োজন। কতগুলো যানবাহন চলছে, কোথায় চার্জ হচ্ছে এবং কী ধরনের সংযোগ ব্যবহার করছে—এসব তথ্য সরকারের কাছে থাকা জরুরি। দ্বিতীয়ত, আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে চার্জিং কার্যক্রম পরিচালনার ওপর কঠোর নজরদারি আরোপ করতে হবে। তৃতীয়ত, অবৈধ সংযোগ ও বিদ্যুৎ চুরির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে এবং কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
চতুর্থত, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের জন্য পৃথক ও নিবন্ধিত চার্জিং স্টেশন গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। এতে বিদ্যুতের ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত হবে, নিরাপত্তা ঝুঁকি কমবে এবং সঠিক রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পঞ্চমত, বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও বৈধ ব্যবহারের বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। জনগণকে বোঝাতে হবে যে বিদ্যুৎ চুরি মানে রাষ্ট্রের সম্পদ চুরি করা।
তবে এসব সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি আরও একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—সেটি হলো জবাবদিহিতা। জনগণ যখন বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন তাদের উদ্বেগকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত। দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিদের বক্তব্য হতে হবে তথ্যভিত্তিক, বাস্তবসম্মত এবং বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য। এমন কোনো মন্তব্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, যা জনগণের ভোগান্তিকে খাটো করে দেখায় কিংবা প্রকৃত সমস্যাকে আড়াল করার চেষ্টা করে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সমালোচনা কোনো অপরাধ নয়। বরং জনগণের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং নিজের সিদ্ধান্ত ও বক্তব্যের জন্য জবাবদিহি করাই একজন জনপ্রতিনিধি বা মন্ত্রীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। যদি কোনো বক্তব্য জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, জনগণের দুর্ভোগকে উপহাসের পর্যায়ে নিয়ে যায় কিংবা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে তার রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে।
আজ দেশের মানুষ বিদ্যুৎ চায়, অজুহাত নয়; কার্যকর সমাধান চায়, দায় এড়ানোর ব্যাখ্যা নয়। বাস্তবতা হলো, তার লম্বা নয়—জনগণের ধৈর্যের সীমাই শেষ হয়ে আসছে। দীর্ঘদিনের ভোগান্তি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং দায়িত্বহীন বক্তব্যের কারণে সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষয় হচ্ছে। এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই একটি উন্নয়নশীল ও আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।
বাংলাদেশ স্মার্ট রাষ্ট্র, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং টেকসই উন্নয়নের যে স্বপ্ন দেখছে, তা বাস্তবায়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও সুশাসিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অপরিহার্য। সেই লক্ষ্য অর্জনে অবৈধ চার্জিং, বিদ্যুৎ চুরি, আবাসিক সংযোগের অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় বিদ্যুতের এই নীরব শত্রুরা শুধু বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকেই নয়, দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

লেখক: জেমস আব্দুর রহিম রানা
সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা