বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে আর রাজনীতি করতে দেবে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, যারা মানুষ হত্যা, গণহত্যা, গুম ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত, অথচ এখনো ক্ষমা চায়নি কিংবা অনুশোচনা প্রকাশ করেনি, তাদের এ দেশে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হবে না।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ঐতিহ্যবাহী আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলূম বাবুনগর মাদ্রাসার ১০৪তম বার্ষিক দ্বীনি মহাসম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ গুম, খুন ও নির্যাতনের মাধ্যমে দেশকে বিপর্যস্ত করে ক্ষমতা থেকে পালিয়ে গেছে। শাপলা চত্বরে আলেম-ওলামাদের হত্যা করা হয়েছে, মসজিদ রক্তাক্ত করা হয়েছে। এমন ফ্যাসিবাদী শক্তিকে দেশে আর রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না। মতপার্থক্য থাকলেও ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ২৩ বছর সময় লেগেছিল। আর ফ্যাসিবাদী ও আলেম-ওলামাবিরোধী শাসন থেকে জনগণকে মুক্ত করতে লেগেছে ১৬ থেকে ১৭ বছর। শাপলা চত্বরে অনেক আলেম-ওলামা জীবন দিয়েছেন। তাঁদের অনেকের নাম ও কবরের ঠিকানাও এখনো অজানা। বহু মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশ ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছে।
জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ওই আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছেন। এর আগে গত ১৬ থেকে ১৭ বছরে প্রায় তিন হাজার মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তিনি নিজেও ছিলেন বলে জানান। এ ছাড়া প্রায় সাত হাজার মানুষ হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং লাখ লাখ মানুষ হামলা-মামলার মাধ্যমে নিপীড়িত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে কি না, এমন প্রশ্ন তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যারা ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্র তৈরি করছে, তাদের চিহ্নিত করতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে গার্মেন্টস খাতে শ্রমিক অসন্তোষ ও অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টার পেছনে ফ্যাসিবাদী শক্তির ইন্ধন রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এ সময় জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, একটি রাজনৈতিক দল ইসলামের কথা বলে রাজনীতি করলেও তাদের দলীয় দলিল ও নির্বাচনী ইশতেহারে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার নেই। শরিয়াভিত্তিক আইন ও শাসনব্যবস্থার পক্ষেও তারা অবস্থান নেয়নি। এমনকি দলীয় দলিল ও মনোগ্রাম থেকেও ‘আকিমুদ্দীন’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিএনপি ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাস করে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন। দেশের সব জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চায় বিএনপি।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা অনুযায়ী দীর্ঘ আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদ বিএনপি অবশ্যই বাস্তবায়ন করবে। আওয়ামী লীগ সংবিধান থেকে ইসলামী মূল্যবোধের যেসব বিষয় বাদ দিয়েছিল, সেগুলো পুনরায় সংযোজন করা হবে। মহান আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস এবং বিসমিল্লাহও পুনঃস্থাপন করা হবে।
আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্দোলনের নামে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করে গঠনমূলক সমালোচনা করতে হবে। সরকারকে সহযোগিতা করা যেতে পারে, তবে দেশের মানুষের স্বার্থবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করা উচিত নয়।
দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকার একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চায়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আলেম-ওলামা ও কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জীবনমান উন্নয়নেও উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির ও বাবুনগর মাদ্রাসার প্রধান পরিচালক আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। পরে তিনি মহাসম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকন, চট্টগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীর, চট্টগ্রাম-৬ আসনের সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৭ আসনের সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া, জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলমসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামারা বক্তব্য দেন।