মোহাম্মদ আলী সুমন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের মানুষ একটি নতুন রাষ্ট্রচিন্তার স্বপ্ন দেখেছিল-যেখানে আইনের শাসন হবে অটুট, মানবাধিকার হবে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু, আর নাগরিকের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর কোনো রাজনৈতিক সমীকরণের কাছে জিম্মি থাকবে না। সেই স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক বাংলাদেশের প্রত্যাশা। কিন্তু সময়ের প্রবাহে সেই আশার আলো যেন ক্রমেই ম্লান হয়ে আসছে। ২০২৬ সালের জুন মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি সেই হতাশারই নির্মম প্রতিচ্ছবি। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস), মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টসসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়-রাজনৈতিক সহিংসতা, মব লিঞ্চিং, হেফাজতে মৃত্যু, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এগুলো রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার গভীর সংকেত।
জুন মাসে সারাদেশে ৫৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং ৩৪৬ জন আহত হয়েছেন। আগের মাস মে-তে নিহত ছিলেন ৫ জন এবং আহত ২৮৯ জন। অর্থাৎ রাজনৈতিক সহিংসতা শুধু অব্যাহত নয়, বরং আরও প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব সংঘাতের বড় অংশই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে নয়, বরং একই দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ২১টি ঘটনায় ৩ জন নিহত ও অন্তত ১৪৬ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে ৮টি ঘটনায় ২ জন নিহত ও ৩৬ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ১৪টি ঘটনায় প্রাণ গেছে ২ জনের, আহত হয়েছেন ১১৫ জন। নিহতদের মধ্যে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, ছাত্রশিবিরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের মানুষ রয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, স্থানীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা-এসব কারণই যেন এখন গণতান্ত্রিক রাজনীতির জায়গা দখল করে নিয়েছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি ভয়ংকরভাবে বেড়ে চলেছে মব সহিংসতা। বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা সমাজকে ক্রমেই বিপজ্জনক করে তুলছে। জুন মাসে ৬৩টি মব সহিংসতার ঘটনায় ৩১ থেকে ৩৩ জন নিহত এবং ৬৯ থেকে ১২৬ জন আহত হয়েছেন। এর আগের মাস মে-তেই মব লিঞ্চিংয়ে ৩২ জন নিহত হয়েছিলেন, যা চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। চুরি, ছিনতাই, গুজব, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ কিংবা নিছক সন্দেহ-এসব অজুহাতে সংঘবদ্ধ জনতা মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করছে। যখন জনতা আদালতের ভূমিকা নেয়, তখন রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের প্রথম তিন মাসেই ৯১৫টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১০টিরও বেশি হত্যা মামলা। এটি কেবল অপরাধ বৃদ্ধির চিত্র নয়, বরং নাগরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভঙ্গুরতারও প্রতিফলন।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংবেদনশীল দায়িত্বগুলোর একটি হলো হেফাজতে থাকা ব্যক্তির জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অথচ জুন মাসেও সেই দায়িত্ব পালনে ভয়াবহ ব্যর্থতার চিত্র সামনে এসেছে। পুলিশ হেফাজত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। দুজন কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন, আর একজন ডিবি হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগের মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন কারাগারে আরও সাতজন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। চট্টগ্রামের যুবলীগ নেতা নুরুল আলম আটকের পরদিন মারা যান। ফরিদপুরের মধুখালীর ইশতিয়াক আহম্মেদ প্রান্তের মৃত্যুকেও ঘিরে পরিবার নির্যাতনের অভিযোগ তুললেও কর্তৃপক্ষ স্বাভাবিক মৃত্যুর দাবি করেছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে কারাগারে অন্তত ৬১ জনের মৃত্যুর তথ্য আরও বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়। কারা অধিদপ্তর নিজেই স্বীকার করেছে, দেশের ৭৪টি কারাগারে প্রায় দেড়শ চিকিৎসকের পদের বিপরীতে স্থায়ী চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র দুজন। পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স নেই, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে আছে। ফলে বন্দিদের সাংবিধানিক অধিকার কার্যত উপেক্ষিত হচ্ছে।
গণতন্ত্রের আরেকটি মৌলিক স্তম্ভ স্বাধীন গণমাধ্যমও একইভাবে চাপে রয়েছে। জুন মাসে অন্তত ৫৯ জন সাংবাদিক হামলা, শারীরিক নির্যাতন, মামলা ও হুমকির শিকার হয়েছেন। ৪০টি পৃথক ঘটনায় ৫১ জন সাংবাদিক সরাসরি শারীরিকভাবে আক্রান্ত হয়েছেন। দুর্নীতির অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে ‘দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’-এর ছয় সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা এবং একজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। একই সময়ে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশসহ বিভিন্ন আইনের আওতায় ১১ জনকে আটক এবং সাতটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর এমন চাপ কেবল সাংবাদিকদের নয়, গোটা সমাজের গণতান্ত্রিক পরিসরকে সংকুচিত করে।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক চিত্রটি নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে। জুন মাসে ৩৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১০৬ জন, যাদের মধ্যে ৭৫ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক। ১৯টি গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, আর ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে দুই কন্যাশিশুকে। যৌতুক, পারিবারিক সহিংসতা এবং অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনাও কমেনি। একই সময়ে ২৯১ জন শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৫৪ জন প্রাণ হারিয়েছে। এই পরিসংখ্যান শুধু অপরাধের সংখ্যা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা, মানসিক বিকাশ এবং রাষ্ট্রের মানবিক চরিত্র নিয়ে গভীর উদ্বেগের প্রতিফলন।
মানবাধিকার সংকট এখানেই থেমে নেই। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, উপাসনালয় ও বসতবাড়িতে ভাঙচুর, শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে মৃত্যু, সীমান্তে গুলিবর্ষণ এবং পুশইনের মতো ঘটনাগুলোও একই বাস্তবতার অংশ। জুন মাসে শ্রমিকদের ৫৫টি ঘটনায় ১১ জন নিহত ও ১৮৪ জন আহত হয়েছেন। কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আরও ৩৯ জন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অন্তত ১২টি হামলার ঘটনায় সাতজন আহত হয়েছেন এবং বিভিন্ন মন্দির ও প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকাতেও প্রাণহানি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম যথার্থই বলেছেন, জুন মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও পরিবর্তনশীল পর্যায় অতিক্রম করেছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমানও একই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন এখনো দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে পুলিশ, তদন্ত সংস্থা এবং কারা ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার ছাড়া পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব নয়।
একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অর্থনীতি, অবকাঠামো কিংবা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় নয়; প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে নাগরিকের অধিকার রক্ষার সক্ষমতার ওপর। যখন মানুষ বিচার পায় না, সাংবাদিক স্বাধীনভাবে লিখতে পারেন না, নারী-শিশু নিরাপদ থাকে না, বন্দি রাষ্ট্রীয় হেফাজতেই প্রাণ হারায় এবং জনতা আদালতের পরিবর্তে রাস্তায় বিচার করতে শুরু করে-তখন বুঝতে হবে সংকট কেবল আইনশৃঙ্খলার নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনেরও।
অতএব, এখন সময় কেবল উদ্বেগ প্রকাশের নয়, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিমূলক সংস্কার, কাস্টোডিয়াল মৃত্যু ও মব সহিংসতার নিরপেক্ষ তদন্ত, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নারী ও শিশু নির্যাতনের দ্রুত বিচার এবং মতপ্রকাশের সাংবিধানিক স্বাধীনতা কার্যকরভাবে রক্ষা-এসব পদক্ষেপ আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও সহিংসতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে গণতান্ত্রিক সহনশীলতার চর্চা করতে হবে, আর নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না; সেটি ছিল একটি নতুন রাষ্ট্রচিন্তার অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার যদি বাস্তব সংস্কারে রূপ না নেয়, তবে ইতিহাস একদিন এই সময়কে হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার অধ্যায় হিসেবেই স্মরণ করবে। মানবাধিকার কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি। সেই ভিত্তি যত দুর্বল হবে, ততই দুর্বল হবে গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং নাগরিকের ভবিষ্যৎ। সময় এখনো পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি, কিন্তু প্রতিটি বিলম্ব আমাদের আরও গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক।