দেশে চলমান জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের ‘আত্মঘাতী নীতি’, অদূরদর্শিতা এবং দলীয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষাকে দায়ী করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর অভিযোগ, অনুগত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার বিদেশ নির্ভর জ্বালানি নীতি গ্রহণ করেছিল। পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানেও প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে ৬৮ বিধিতে উত্থাপিত একটি নোটিশের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দলের বিভিন্ন প্রস্তাবের জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
অধিবেশনের ওই পর্যায়ে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। এর আগে বিকেল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।
পূর্ববর্তী সরকারের নীতির সমালোচনা
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমানে দেশে যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে, তার পেছনে আগের সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনা রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানের বদলে বিদেশের ওপর নির্ভরশীল নীতি গ্রহণ করেছিল। অনুগত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে দেশের জ্বালানি খাতকে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই ভঙ্গুর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংকটেও তেলের দাম বাড়ানো হয়নি
বিরোধী দলের প্রস্তাবের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গালফ যুদ্ধের মতো সংকট তৈরি হয়। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়।
তবে কৃষকদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়নি বলে জানান তিনি।
পরবর্তী সময়ে সীমান্ত এলাকায় তেল পাচার বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি মোকাবিলায় তেলের দাম সহনীয় পর্যায়ে পুনর্নির্ধারণ করতে হয়েছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে অতিরিক্ত করের চাপ না দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ কমানোর চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন তিনি।
১৮ মাসে তৃতীয় এফএসআরইউ
এলএনজি সংকট মোকাবিলা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সমুদ্রে ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপনে সময় লাগলেও সরকার দ্রুত বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিচ্ছে।
মাতারবাড়ীতে চীন সরকারের সঙ্গে ‘জি টু জি’ চুক্তির আওতায় তৃতীয় এফএসআরইউ ১৮ মাসের মধ্যে স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই এলাকায় একটি ভূমিনির্ভর এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
এসব প্রকল্প থেকে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে শত শত কিলোমিটার উন্নত পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানান তিনি।
বড়পুকুরিয়ায় হবে ৬০০ মেগাওয়াটের নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র
দেশীয় কয়লা ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বড়পুকুরিয়ার দেশীয় কয়লা ব্যবহার করে ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার নতুন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
একই সঙ্গে বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে সংস্কারকাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, বৈশ্বিক আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নের বিধিনিষেধ থাকলেও ২০২১ সালের আগের চুক্তির আওতায় পায়রা দ্বিতীয় পর্যায়ের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ দ্রুত শুরু করার বিষয়ে সরকারের আলোচনা চলছে।
সঞ্চালন ও গ্রিড লাইনের ঘাটতি দেখা দিলে নিজস্ব জিওবি তহবিল থেকে অর্থায়ন করে প্রয়োজনীয় গ্রিড লাইন নির্মাণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন উদ্যোগ
জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন দেশে অনশোর ও অফশোর কোনও গ্যাসকূপ অনুসন্ধান করা হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থল ও সমুদ্র উভয় এলাকায় গ্যাসকূপ খনন ও অনুসন্ধান জোরদার করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে ভোলায় গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ সচল করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সেখানে পাওয়া গ্যাসকে কাজে লাগিয়ে সার কারখানা ও নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
মাতারবাড়ীতে বড় এলপিজি টার্মিনাল
দেশে এলপিজির চাহিদা পূরণে মাতারবাড়ীতে বড় আকারের এলপিজি টার্মিনাল ও স্টোরেজ অবকাঠামো নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও যাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস খালাস করা যায়, সে জন্য একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাসমান সিবিএস প্রযুক্তির টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
ছয় মাসেই দৃশ্যমান পরিবর্তনের দাবি
বিরোধী দলের দেওয়া সময়সীমার প্রসঙ্গ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একটি সরকার যখন ভঙ্গুর আর্থিক ও জ্বালানি ব্যবস্থা উত্তরাধিকারসূত্রে পায়, তখন রাতারাতি পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।
তবে প্রধানমন্ত্রী ছয় মাসের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার যে মহাপরিকল্পনা বা ‘আই হ্যাভ প্ল্যান’ নীতি নিয়েছেন, সেটি ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানো নয়। কয়লা, বায়ু, সৌরশক্তি ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বয়ে দুর্যোগসহনশীল ও টেকসই জ্বালানি খাত গড়ে তোলা হচ্ছে।
এর ফলে দেশে বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ আরও অনুকূল হবে এবং শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত জ্বালানি সংকটে পড়বে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সরকার প্রতিটি সমস্যার টেকসই সমাধানে কাজ করছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যেই দেশের চলমান জ্বালানি সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।