ধূমপান ও বায়ুদূষণের কারণে মানুষের রক্তে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে পারে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপান ও দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং ন্যানোপ্লাস্টিক প্রবেশ করার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এছাড়া রক্তের সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির সঙ্গে হার্ট অ্যাটাকের একটি জোরালো সংযোগও খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা। অক্সফোর্ড একাডেমিকের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।
ইতালিতে পরিচালিত এ গবেষণা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের হ্যাকেনস্যাক ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ড. ক্রেইগ বাসম্যান বলেন, হৃদ্রোগে আক্রান্ত রোগীদের রক্তে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।
তার মতে, গবেষণার ফলাফল মাইক্রোপ্লাস্টিক ও হৃদ্রোগের মধ্যে সম্ভাব্য একটি সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। তবে এটি মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি হৃদ্রোগ বা হার্ট অ্যাটাকের কারণ—এমন কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ দেয় না।বিশেষজ্ঞরা জানান, বর্তমানে পরিবেশের প্রায় সর্বত্রই মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে এসব কণার সংস্পর্শ পুরোপুরি এড়িয়ে চলা মানুষের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
ইতালির রোমের সাপিয়েঞ্জা ইউনিভার্সিটির সান্ত’আন্দ্রেয়া হাসপাতালের গবেষক পাসকুয়ালে পাওলিসোর নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষকরা হৃদ্যন্ত্রে রক্ত সরবরাহকারী রক্তনালি থেকে ৬১ জন রোগীর রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেন। তাদের মধ্যে কেউ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত ছিলেন, কেউ হার্ট অ্যাটাক ছাড়াই হৃদ্রোগে ভুগছিলেন এবং কিছু রোগীর রক্তনালি ছিল সুস্থ।
গবেষণায় দেখা যায়, হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত রোগীদের ৮৪ শতাংশের রক্তে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। হৃদ্রোগ থাকলেও হার্ট অ্যাটাক হয়নি, এমন রোগীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৪০ শতাংশ। আর সুস্থ রক্তনালির রোগীদের ৩২ শতাংশের রক্তে এসব কণা পাওয়া যায়।
তবে গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি ছিল ধূমপান ও বায়ুদূষণের সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্পর্ক। গবেষকদের হিসাবে, ধূমপায়ীদের রক্তে উচ্চ মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকার সম্ভাবনা অধূমপায়ীদের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি। নিয়মিত বেশি মাত্রার বায়ুদূষণের সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।
ধূমপান ও বায়ুদূষণ দুই ধরনের ঝুঁকির মধ্যে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির রক্তে উচ্চ মাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। বিপরীতে, এসব ঝুঁকির কোনোটির সংস্পর্শে না থাকা ব্যক্তিদের মাত্র ১২ দশমিক ৫ শতাংশের রক্তে উচ্চ মাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
গবেষকদের ধারণা, ধূমপান ও বায়ুদূষণের কারণে ফুসফুসের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও আরও ক্ষুদ্র ন্যানোপ্লাস্টিক রক্তপ্রবাহে প্রবেশের সুযোগ বাড়তে পারে।
এদিকে ধূমপান ও বায়ুদূষণ দুটিই ফুসফুসের মাধ্যমে এসব কণা শরীরে প্রবেশের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে বলে জানান গবেষণার প্রধান লেখক পাসকুয়ালে পাওলিসো।
গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক এমানুয়েলে বারবাতো অবশ্য সতর্ক করেন, এই গবেষণা মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি হার্ট অ্যাটাক ঘটায় এমন প্রমাণ দেয় না। তবে পরিবেশগত দূষণ, রক্তে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি এবং হৃদ্রোগের মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
জানা যায়, গত ১৫ জুলাই ইউরোপিয়ান হার্ট জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটিতে মাত্র ৬১ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাই মাইক্রোপ্লাস্টিক কীভাবে শরীরে প্রবেশ করে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকিতে এর প্রকৃত ভূমিকা কী, তা নিশ্চিত করতে আরও বড় পরিসরে গবেষণা প্রয়োজন।