June 16, 2026, 12:46 pm

লালমনিরহাটে শিশু হত্যা: অভিযুক্ত আটক, বাড়িঘরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ

লালমনিরহাট প্রতিনিধি :

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামে প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। এ ঘটনার জেরে উত্তেজিত জনতা অভিযুক্তের বাড়িঘরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে তিনটি বসতঘর ও ঘরের আসবাবপত্র আগুনে পুড়ে যায়।

ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষুব্ধ জনতার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় জনতার ছোড়া ইট-পাটকেলের আঘাতে জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি)সহ ১৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। এছাড়া পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকের গাড়িসহ মোট ছয়টি সরকারি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘটনাস্থলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয় এবং পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। আহতদের আদিতমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানান, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে আদিতমারী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নাজমুল হককে থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত (ক্লোজড) করা হয়েছে।

নিহত শিশুর পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ, শিশুটিকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশ সুপার বলেন, “শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়টি ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।” মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

আটক অভিযুক্ত ব্যক্তি হলেন ফলিমারী গ্রামের ধনঞ্জয় বর্মণের ছেলে বিধান চন্দ্র বর্মণ (২৩)। নিহত শিশু নন্দিনী রানী (৭) একই গ্রামের কৃষক নলিনী চন্দ্র বর্মণের মেয়ে এবং স্থানীয় ব্র্যাক প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের বরাতে জানা যায়, সোমবার বিকেলে প্রতিদিনের মতো খেলাধুলার জন্য বাড়ি থেকে বের হয় নন্দিনী। সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড়িতে ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। সারারাত খোঁজ করেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।

মঙ্গলবার সকালে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি গ্রামের জাবেদ আলীর ভুট্টাখেতে ভাঙা গাছ দেখতে পেয়ে সন্দেহ করেন। পরে তারা ভেতরে গিয়ে একটি গর্ত দেখতে পান। সেখানে বস্তাবন্দী অবস্থায় শিশুটির মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া ছিল। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।

নিহত শিশুর বাবা নলিনী চন্দ্র বর্মণ বলেন, “আমার সঙ্গে কারও কোনো শত্রুতা নেই। আমি একজন সাধারণ কৃষক। সোমবার দুপুরেও মেয়ের সঙ্গে একসঙ্গে খেয়েছি। আমার মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।”

তিনি অভিযোগ করেন, মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সোমবার রাত ১১টার দিকে আদিতমারী থানায় অভিযোগ করতে গেলে কর্তব্যরত পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। “সেই সময় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হলে হয়তো আমার মেয়েকে জীবিত পাওয়া যেত,” বলে দাবি করেন তিনি।

নন্দিনীর মা সাবিত্রী রানী বলেন, “আমার মেয়েটি প্রতিদিনের মতো খেলতে বের হয়েছিল। বাড়ির আশপাশে বেশ কয়েকটি ভুট্টাখেত রয়েছে। হয়তো তাকে প্রলোভন দেখিয়ে বা জোর করে সেখানে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।”

আদিতমারী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তুহিন মিয়া জানান, নিহত শিশুর বাবা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এছাড়া এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, তা জানতে আটক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর হামলা এবং সরকারি যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, “ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ যথাসময়ে গ্রহণ না করায় সংশ্লিষ্ট ওসির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে”।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা