May 20, 2026, 11:22 pm

সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় বসানোর পরিকল্পনা ছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের

যুদ্ধের প্রথম দফার হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ও অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারা নিহত হওয়ার কয়েক দিন পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেন, তার মতে ‘ভেতর থেকেই কেউ’ ইরানের ক্ষমতা গ্রহণ করলে সবচেয়ে ভালো হয়। তবে এখন জানা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যুদ্ধের শুরুতেই এমন একজন নির্দিষ্ট এবং অনেকটা চমকপ্রদ ব্যক্তিকে মাথায় রেখেছিল। তিনি হলেন ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। তিনি তার কঠোরপন্থী এবং ইসরাইলবিরোধী ও মার্কিনবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত।

কিন্তু এই সাহসী পরিকল্পনা, যা ইসরাইল তৈরি করেছিল এবং যেখানে আহমাদিনেজাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছিল, দ্রুতই ব্যর্থ হয়ে যায়। এমনটাই জানিয়েছেন এ বিষয়ে ব্রিফিং পাওয়া মার্কিন কর্মকর্তারা। মার্কিন ও ইসরাইলি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দিনেই তেহরানে আহমাদিনেজাদের বাড়িতে ইসরাইলি হামলায় তিনি আহত হন। হামলাটি মূলত তার নিরাপত্তা প্রহরীদের সরিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল, যারা তাকে গৃহবন্দি অবস্থায় নজরদারিতে রেখেছিল। কর্মকর্তা ও আহমাদিনেজাদের এক সহযোগী জানান, তিনি হামলায় বেঁচে যান। তবে এই ঘটনাকে ঘিরে পরিকল্পনা নিয়ে তার মনোভাব বদলে যায় এবং তিনি হতাশ হয়ে পড়েন। এরপর থেকে তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি এবং তার বর্তমান অবস্থান ও শারীরিক অবস্থা অজানা।
আহমাদিনেজাদকে এমন একজন সম্ভাব্য নেতা হিসেবে ভাবা হয়েছিল, যা অনেকের কাছে অত্যন্ত অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত মনে হতে পারে। কারণ, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে তিনি ইসরাইলকে ‘মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা উচিত’ বলে মন্তব্য করেন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির দৃঢ় সমর্থক এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি অভ্যন্তরীণ বিরোধীদের কঠোরভাবে দমন করেন। কীভাবে তাকে এই পরিকল্পনায় যুক্ত করা হয়েছিল তা এখনো অজানা।

এই পরিকল্পনার অস্তিত্ব আগে কখনো প্রকাশ হয়নি। এটি ইসরাইলের একটি বহু ধাপের কৌশলের অংশ ছিল, যার লক্ষ্য ছিল ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা উৎখাত করা। এটি দেখিয়ে দেয় যে, ডনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুদ্ধ শুরুর সময় শুধু সামরিক লক্ষ্য নয়, বরং রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলের একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনাও বিবেচনা করেছিলেন। তা তাদের ঘোষিত সীমিত লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে কিছুটা সাংঘর্ষিক।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুরু থেকেই অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’র লক্ষ্য স্পষ্ট করেছিলেন। তা হলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা, তাদের নৌবাহিনী দুর্বল করা এবং তাদের প্রক্সি শক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। মার্কিন সেনাবাহিনী তাদের সব লক্ষ্য পূরণ করেছে এবং এখন আমাদের আলোচকরা এমন একটি চুক্তি করতে কাজ করছে, যা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা স্থায়ীভাবে শেষ করবে। ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে মার্কিন কর্মকর্তারা ইসরাইলের সঙ্গে মিলে এমন একজন বাস্তববাদী ব্যক্তি খুঁজে বের করার পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন, যিনি ইরানের ক্ষমতা নিতে পারেন। তাদের দাবি ছিল, ইরানের ভেতরে এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছে যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী, যদিও তাদের সরাসরি মধ্যপন্থী বলা যায় না।

ট্রাম্প তখন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার অভিযানের সাফল্য নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন। এটা তিনি অন্য দেশেও প্রয়োগযোগ্য মনে করছিলেন। আহমাদিনেজাদ আগে ধর্মীয় শাসনের কঠোর সমালোচকদের একজন ছিলেন। পরে ধীরে ধীরে সরকারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন এবং দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। তাকে একাধিকবার নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয় এবং তার সহযোগীদেরও গ্রেপ্তার করা হয়।
২০১৭, ২০২১ এবং ২০২৪ সালে তিনি আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলেও ইরানের গার্ডিয়ান কাউন্সিল তা প্রত্যাখ্যান করে। পরবর্তীতে তিনি কিছুটা বিরোধী কণ্ঠে পরিণত হন, যদিও পুরোপুরি প্রকাশ্য বিরোধী ছিলেন না। ২০১৯ সালে তিনি এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের প্রশংসা করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক পুনর্মিলনের কথা বলেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প একজন কর্মঠ মানুষ। তিনি ব্যবসায়ী হিসেবে খরচ-লাভ হিসাব করতে পারেন। আমাদের উচিত দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনা করা।
আহমাদিনেজাদের ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগও উঠেছে।
২০১৮ সালে তার সাবেক চিফ অব স্টাফ এসফানদিয়ার রহিম মাশাইয়ের বিরুদ্ধে বৃটিশ ও ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগে বিচার হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আহমাদিনেজাদের বিদেশ সফর নতুন করে সন্দেহ ও গুঞ্জন তৈরি করে। ২০২৩ সালে তিনি গিয়েছিলেন গুয়াতেমালা এবং ২০২৪-২০২৫ সালে হাঙ্গেরিতে। সেখানে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এই সফরগুলো তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন তোলে।
যুদ্ধ শুরুর সময় তিনি খুব কমই প্রকাশ্যে কথা বলেন এবং সামাজিক মাধ্যমে সীমিত প্রতিক্রিয়া দেন। তার নীরবতা অনেক ইরানি সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। ইসরাইলের পরিকল্পনা অনুযায়ী যুদ্ধটি কয়েক ধাপে এগোনোর কথা ছিল। প্রথমে বিমান হামলা ও শীর্ষ নেতাদের হত্যা, এরপর কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ তৈরি, তারপর রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে সরকার পতন ঘটানো। কিন্তু বাস্তবে এই পরিকল্পনার বড় অংশই ব্যর্থ হয় এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকে যায়। তবুও কিছু ইসরাইলি কর্মকর্তা এখনও বিশ্বাস করেন, তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সফল হতে পারত যদি পুরো অপারেশন চালু করা যেত।
মোসাদের প্রধান ডেভিড বার্নিয়া ঘনিষ্ঠদের জানিয়েছেন, পরিকল্পনাটি সফল হওয়ার ভালো সম্ভাবনা ছিল বলে তিনি মনে করেন- যদি সেটি পুরোপুরি অনুমোদন পেত।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা