April 14, 2026, 10:52 pm

হেলা বৈশাখ উৎসবে উচ্ছ্বাসে মাতলেন বিদেশি পর্যটকরা

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হওয়া বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় যোগ দিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বিদেশি পর্যটক ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকর্মীদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। লাল–সাদা সাজে সজ্জিত হয়ে তারা শোভাযাত্রার রঙিন মুহূর্ত উপভোগ করেন এবং বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় মুগ্ধতা প্রকাশ করেন।

কেউ ক্যামেরা হাতে শোভাযাত্রার রঙিন মুহূর্ত ধারণে ব্যস্ত, আবার কেউ বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতায় মেতে উঠেছেন। অনেক বিদেশিকেই দেখা গেছে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী লাল-সাদা পোশাকে সেজে উৎসবের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে।

নারীদের কপালে লাল টিপ, খোপায় গোঁজা ফুল এবং হাতে-মুখে আলপনার নকশা ছিল বিশেষভাবে নজরকাড়া। অনেকের হাতে লেখা ছিল-‘এসো হে বৈশাখ’।
পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা লন্ডন, চীন, কোরিয়া, পর্তুগাল, রাশিয়া ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এই শোভাযাত্রা উপভোগ করতে ঢাকায় এসেছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ ঢাকায় অবস্থিত বিভিন্ন দূতাবাসে কর্মরত, আবার কেউ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবে অনুষ্ঠানটি কাভার করতে এসেছেন।

লন্ডন থেকে আগত চার্লস নোড বলেন, আমি বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষকে অনেক ভালোবাসি। এখানে মানুষের আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করে। আজকের এই শোভাযাত্রায় অংশ নিতে পেরে সত্যিই ভালো লাগছে।

ভারতের ত্রিপুরা থেকে আসা নয়ন ভার্মা বলেন, আমাদের দেশেও বৈশাখ পালিত হয়। তবে বাংলাদেশের মতো এত বড় ও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন খুব কমই দেখা যায়। তাই মনের টানেই এখানে চলে এসেছি।

রাশিয়া থেকে আগত এক ফ্রিল্যান্স গণমাধ্যমকর্মী বলেন, বিশেষ সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলো বিশ্বের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব গণমাধ্যমের। ঢাকার এই শোভাযাত্রা খুবই বর্ণাঢ্য ও ব্যতিক্রমী। তাই এটি কাভার করতে আমি রাশিয়া থেকে এসেছি।

শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া বিদেশি অতিথিরা জানান, এ আয়োজন শুধু একটি উৎসব নয়, বরং এটি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রকাশ। তারা আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতেও এই উৎসব বিশ্বব্যাপী আরও বেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হওয়া এই শোভাযাত্রা রাজধানীর শাহবাগ, টিএসসি, দোয়েল চত্বরসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করে। দেশি-বিদেশি মানুষের অংশগ্রহণে পুরো এলাকা পরিণত হয় এক মিলনমেলায়।

মঙ্গলবার সকাল ৯টায় শুরু হওয়া শোভাযাত্রাটি চারুকলা অনুষদ থেকে শাহবাগ, দোয়েল চত্বর ও বেগম রোকেয়া হল এলাকা ঘুরে আবার চারুকলা অনুষদের সামনে এসে শেষ হয়।

এতে অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, উপ-উপাচার্য সায়মা হক বিদিশা, উপ-উপাচার্য ড. আব্দুস সালাম, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিদ্দিকুর রহমান খান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য লুৎফর রহমানসহ বিভিন্ন অনুষদের ডিন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধি এবং নগরবাসী।

ইউনেস্কো স্বীকৃত এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে অংশ নিতে সকাল থেকেই চারুকলা এলাকায় ভিড় করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। অনেককে দেখা যায় সাদা-লাল রঙের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত হয়ে শোভাযাত্রায় অংশ নিতে।

শোভাযাত্রার শুরুতে ছিল মহানগর পুলিশের ১০টি ঘোড়সওয়ার দল। তাদের পেছনে জাতীয় পতাকা বহন করে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীর একটি দল অংশ নেয়।

এরপর মূল ব্যানারসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষ, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, শিক্ষক, জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংসদ, কবিতা পরিষদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন।

শোভাযাত্রার আকর্ষণ হিসেবে ছিল পাঁচটি বড় মোটিফ-মোরগ, বেহালা, শান্তির পায়রা, হাতি ও ঘোড়া। এছাড়া প্রায় ৪০ জন শিল্পীর বাদ্যযন্ত্র পরিবেশনা এবং প্রায় ১৫০ ফুট দীর্ঘ পটচিত্রের স্ক্রল পেইন্টিং শোভাযাত্রায় বিশেষ মাত্রা যোগ করে। এতে অংশ নেয় দেশের ১০টি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরাও, যা আয়োজনটিকে বহুসাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে।

শোভাযাত্রায় অংশ নিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত হাজারো মানুষ চারুকলা এলাকায় সমবেত হন। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে পুরো আয়োজন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল রঙিন মুখোশ, প্রতীকী মোটিফ, গ্রামীণ ঐতিহ্যের নানা উপস্থাপন এবং বাঙালির লোকজ সংস্কৃতির অনুষঙ্গ।

এবারের শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতি, বৈচিত্র্যময় জাতিসত্তা এবং সম্প্রীতির বার্তা বিভিন্ন শিল্পকর্ম ও প্রতীকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে পাহাড়ি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ আয়োজনটিকে দিয়েছে নতুন মাত্রা।

শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে চারুকলা এলাকা ও আশপাশের সড়কে নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরাও দায়িত্ব পালন করেন।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা