April 14, 2026, 10:46 pm

বৈশাখী শোভাযাত্রা আজ সারাবিশ্বে বাঙালির প্রধান সাংস্কৃতিক আন্দোলন

বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়; এটি বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক। সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে উদযাপনের ধরন, যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা; তবু মানুষের অংশগ্রহণ ও আবেগে এই উৎসব আজও সমানভাবে প্রাণবন্ত।

বাংলা নববর্ষের শোভাযাত্রার ইতিহাসে যশোরের চারুপীঠের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

১৯৮৫ সালে শিক্ষক, ছাত্র ও সাধারণ জনতাকে নিয়ে যশোরের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান চারুপীঠের উদ্যোগে প্রথম বর্ষবরণ শোভাযাত্রার সূচনা হয়।

ঢাকাকেন্দ্রিক চারুকলার শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে জেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া এবং শিল্পকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
চারুপীঠের প্রধান উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মাহবুব জামাল শামীম বাংলানিউজকে বলেন, চারুপীঠ মূলত একটি আন্দোলনের ডাক।

এ ডাকের মাধ্যমে গ্রামের আবহ, ঐতিহ্য ও শিল্পকে সারাবাংলায় ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
চারুপীঠ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের চিরকালীন লোকজ ঐতিহ্য ও চারুকলার চর্চাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং শিশু-কিশোর ও তরুণদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা।

তিনি জানান, প্রখ্যাত শিল্পী এস এম সুলতানের দর্শন ও প্রেরণায় এবং শিল্পী হিরন্ময়ী চন্দ্র, মোখলেছুর রহমানসহ চারুকলার প্রায় ৫০০ শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও একদল তরুণ শিল্পীর অংশগ্রহণে চারুপীঠ গড়ে ওঠে। তাদের লক্ষ্য ছিল লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণ, সৃজনশীলতা বিকাশ এবং চারুকলাকে সারাদেশে সামাজিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

অধ্যক্ষ মাহবুব জামাল শামীম বলেন, চারুপীঠ একসময় যশোরকেন্দ্রিক থাকলেও পরবর্তীতে সারা দেশে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও চারুপীঠ দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়াই নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে এই উদ্যোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে।

পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা স্বৈরাচারবিরোধী মনোভাব ও সাংস্কৃতিক জাগরণের অংশ হিসেবে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’র আয়োজন করেন। শুরুতে এটি আনন্দ শোভাযাত্রা বা বৈশাখী শোভাযাত্রা নামে পরিচিত থাকলেও পরে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর ফলে এই আয়োজন শুধু জাতীয় নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিশেষ মর্যাদা লাভ করে।

সব মিলিয়ে এটি এখন শুধু একটি উৎসব নয়; বরং বাংলা সংস্কৃতি, প্রতিবাদ ও সামাজিক চেতনার একটি শক্তিশালী প্রতীক।

বাংলা নববর্ষ এখন শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; প্রবাসেও বাঙালিরা উৎসবটি পালন করে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখছেন। বিশ্বজুড়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর ধরন একেক দেশে একেক রকম। কোথাও ধর্মীয় আচার, কোথাও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, আবার কোথাও আধুনিক আয়োজন ও উৎসবের মধ্য দিয়ে মানুষ নতুন বছরকে বরণ করে নেয়।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মধ্য এপ্রিল ঘিরে নতুন বছর উদযাপিত হয় ভিন্ন ভিন্ন নামে। দেশভেদে নাম ও রীতিতে কিছু পার্থক্য থাকলেও উৎসবের মূল চেতনা প্রায় একই।

বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দিনটি পহেলা বৈশাখ নামেই উদযাপিত হয়। ভারতের আসামে এ উৎসব পরিচিত ‘রঙালি বিহু’ নামে, আর পাঞ্জাবে শিখ সম্প্রদায়ের কাছে এটি ‘বৈশাখী’ নামে পরিচিত।

নেপালে নববর্ষ উদযাপিত হয় ‘বিস্কেট যাত্রা’ নামে। থাইল্যান্ডে এ উৎসবের নাম ‘সংক্রান’, যেখানে পানি ছিটিয়ে আনন্দ উদযাপন করা হয়। শ্রীলঙ্কায় এটি ‘আলুথ আউরুদু’ নামে পালিত হয় এবং কম্বোডিয়ায় পরিচিত ‘চৌল চ্নাম থমে’ নামে।

ভারতের তামিল সম্প্রদায়ের মধ্যে নববর্ষ পালিত হয় ‘চিত্রাই উৎসব’ নামে। এছাড়া চীনের ইউনান প্রদেশে দাই সম্প্রদায় একই সময়ে তাদের নববর্ষ উদযাপন করে ‘দাই নববর্ষ উৎসব’ নামে।

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যেও একই সময়ে নববর্ষ উদযাপনের প্রচলন রয়েছে।

চাকমাদের ‘বিজু’, মারমা ও রাখাইনদের ‘সাংগ্রাই’, ত্রিপুরাদের ‘বৈসু’ নামে এ উৎসব পালিত হয়। সম্মিলিতভাবে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের এই উৎসব ‘বৈসাবি’ নামে পরিচিত।

এছাড়া ম্রো জনগোষ্ঠী এ সময় ‘চাংক্রান পোই’ নামে নববর্ষ উদযাপন করে।

নামে ভিন্নতা থাকলেও এসব উৎসবের মূল লক্ষ্য একটাই—পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে আনন্দ, আশা ও উৎসবের মধ্য দিয়ে স্বাগত জানানো।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্যাকসন হাইটস ও টাইমস স্কয়ার এলাকায় বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে ‘নববর্ষের জয়গান’ নামে জাঁকজমকপূর্ণ সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে যেন আরেকটি বাংলাদেশে রূপান্তর ঘটে।

টাইমস স্কয়ারে বৈশাখী মেলায় অংশগ্রহণকারী অ্যাপোলো খান বলেন, এই উৎসবটি পালনে সকল বাংলাদেশি মুখিয়ে থাকে। আমরা আমাদের দেশের শিল্প ও ঐতিহ্য বিদেশের মাটিতে তুলে ধরি। এখানে বসবাসরত সকল বাংলাদেশির আর্থিক সহযোগিতা ও নিজস্ব উদ্যোগে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্রঙ্কসে বসবাসরত শিরিন আক্তার রুমা বলেন, এখানে আমরা বৈশাখী মেলা করি, নাচ-গান ও খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করি; কিন্তু নিজের দেশের মতো এতটা আনন্দ লাগে না। সবকিছু যেন কৃত্রিম মনে হয়, নিজের দেশকে খুব মনে পড়ে।

লন্ডনের ব্রিক লেন, টাওয়ার হ্যামলেটসসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতি বছর বৈশাখী মেলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন হয়। এখানে লাইভ মিউজিক, বাংলা গান, নাচ ও নানা অনুষ্ঠান হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রার আদলে বর্ণিল শোভাযাত্রাও বের করা হয়।

লন্ডনের বাসিন্দা উম্মে খাদিজা লাবনী বলেন, নিজের দেশের পহেলা বৈশাখের আনন্দের মতো আর কোথাও নেই। এখানে সব আছে, কিন্তু বাংলাদেশের মতো সুখ নেই। পরিবারের সঙ্গে পান্তা খাওয়ার মজা কোথাও পাওয়া যাবে না। তবে দেশি-বিদেশি সবাই একসঙ্গে আনন্দ করে, এটা দেখতে ভালো লাগে।

বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ শহর ও গ্রাম দুই পরিবেশেই উৎসবমুখর আবহে উদযাপিত হয়। আয়োজনের ধরন ভিন্ন হলেও উৎসবের মূল চেতনা একই থাকে—ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও নতুন বছরের শুভ সূচনাকে আনন্দের সঙ্গে বরণ করা।

শহরাঞ্চলে নববর্ষ এখন বড় সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। ভোরবেলা সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের আয়োজন থাকে গান, কবিতা আবৃত্তি ও নৃত্যানুষ্ঠানের। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে চারুকলা ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়।

রমনা বটমূলসহ গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে বর্ষবরণের আয়োজন থাকে, যেখানে হাজারো মানুষ লাল-সাদা পোশাক পরে অংশ নেয়। এছাড়া মেলা, নাট্য আয়োজন, কনসার্ট এবং পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে ঘরোয়া উৎসবের মধ্য দিয়েও দিনটি উদযাপিত হয়। অনেকেই এদিন পান্তা-ইলিশসহ ঐতিহ্যবাহী খাবারের আয়োজন করেন।

অন্যদিকে গ্রামবাংলায় নববর্ষের আবহ আরও বেশি লোকজ ও আন্তরিক। সকালে নতুন পোশাক পরে একে অপরকে শুভেচ্ছা জানানোর মধ্য দিয়ে দিন শুরু হয়।

অনেক এলাকায় বৈশাখী মেলা বসে, যেখানে নাগরদোলা, খেলনা, মাটির তৈজসপত্র, মিষ্টি ও গ্রামীণ পণ্যের দোকান থাকে। কোথাও কোথাও লাঠিখেলা, গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন হিসাব শুরু করার অংশ হিসেবে ‘হালখাতা’ খোলার ঐতিহ্যও রয়েছে। খাবারের তালিকায় থাকে পান্তা ভাত, ভর্তা, শুঁটকি, পিঠাসহ দেশীয় নানা পদ।

বিদেশিদের কাছেও বাংলা নববর্ষ দিন দিন আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে বসবাসরত বিদেশি কূটনীতিক, উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী ও পর্যটকেরা বৈশাখী আয়োজনে সরাসরি অংশ নেন।

নববর্ষের দিন অনেক বিদেশিকে লাল-সাদা পোশাক পরে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিতে দেখা যায়। তারা রমনা বটমূলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চারুকলার শোভাযাত্রা, বৈশাখী মেলা ও লোকজ পরিবেশনা উপভোগ করেন। অনেকে পান্তা-ইলিশ, ভর্তা, পিঠাসহ ঐতিহ্যবাহী খাবারও চেখে দেখেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।

এতে বাংলাদেশের সংস্কৃতির প্রতি তাদের আগ্রহ ও সম্মান প্রকাশ পায়। সব মিলিয়ে বিদেশিদের কাছে বাংলা নববর্ষ শুধু একটি উৎসব নয়; বরং বাংলাদেশের ইতিহাস, লোকজ ঐতিহ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি জীবন্ত প্রতীক হিসেবে ধরা দেয়।

একসময় পহেলা বৈশাখের প্রধান আকর্ষণ ছিল গ্রামীণ মেলা। সময়ের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে বৈশাখী শোভাযাত্রা যুক্ত হয়ে উৎসবটি নতুন মাত্রা পায়। ফলে লোকজ ঐতিহ্য ও আধুনিক সাংস্কৃতিক উপস্থাপনার সমন্বয়ে পহেলা বৈশাখ আজ একটি জাতীয় সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।

সময়ের সঙ্গে উৎসবের ধরন বদলেছে, এ কথা সত্য। তবে জৌলুস হারিয়েছে, এমনটা বলা কঠিন।

সব মিলিয়ে যশোরের চারুপীঠ থেকে শুরু হওয়া বৈশাখের শোভাযাত্রা সারা দেশে জাতীয় পরিচয়ের এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি শুধু উৎসব নয়; বরং ঐতিহ্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও সামাজিক চেতনার এক শক্তিশালী প্রকাশ।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা