January 16, 2026, 5:37 am

যশোরের মনিরামপুরে বেগম রোকেয়া দিবস উদযাপনে বর্ণাঢ্য র‍্যালি, আলোচনা সভা ও অদম্য নারীদের সম্মাননা প্রদান

জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর: সারাদেশের মতো যশোরের মনিরামপুরেও নানা আয়োজনে বেগম রোকেয়া দিবস উদযাপন করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) সকালে উপজেলা প্রশাসন, পৌরসভা, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর এবং জাতীয় মহিলা সংস্থার যৌথ উদ্যোগে পৌরবাজার এলাকায় ঢাকঢোল পিটিয়ে বর্ণাঢ্য র‍্যালির মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনের কর্মসূচি। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বের হওয়া র‍্যালিটি পৌরসভার প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে উপজেলা চত্বরে এসে শেষ হয়। এতে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, নারী সংগঠনের সদস্য, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন।

র‍্যালি শেষে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় এক আলোচনা সভা এবং অদম্য নারীদের সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সম্রাট হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাসুদুর রহমান, পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ তৌফিকুল আলম, মনিরামপুর মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ মহিবুল্লাহ, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের ক্রেডিট সুপারভাইজার মোঃ শহিদুল ইসলাম, জাতীয় মহিলা সংস্থার প্রকল্প কর্মকর্তা মোহাম্মদ বকুল আহমেদ, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফাইয়াজ আহমেদ ফয়সাল এবং মনিরামপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি মজনুর রহমান। এছাড়া নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (ইউআইআইপি), এলজিইডি, পৌরসভা ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

দিবসটি উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচিতে মনিরামপুরের চারজন অদম্য নারীকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়, যারা নিজেদের জীবনের সংগ্রাম, সাফল্য ও কাজের মাধ্যমে সমাজে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এর মধ্যে শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখায় সম্মাননা পান উপজেলার চন্ডিপুর গ্রামের শহিদুল ইসলামের স্ত্রী রাশিদা আক্তার। তিনি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাক্ষেত্রে সেবা দিয়ে আসছেন এবং নারীদের কর্মদক্ষতা উন্নত করা ও শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করতে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রাখছেন। তার এ অর্জন স্থানীয় নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সমাজ উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য সম্মাননা প্রদান করা হয় ব্রহ্মপুর গ্রামের কল্যাণ রায়ের স্ত্রী সূচনা রায়কে। গ্রামীণ নারীদের সংগঠিত করা, তাদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে উদ্বুদ্ধ করা, মানবিক সেবা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে তার ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয় অনুষ্ঠানে। স্থানীয় সমাজে তিনি উন্নয়নকর্মী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।

অন্যদিকে, গার্হস্থ্য নির্যাতনের বিভীষিকা অতিক্রম করে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর অসামান্য সাহসিকতার জন্য সম্মাননা প্রদান করা হয় ঢাকুরিয়া গ্রামের ইকবাল হোসেনের স্ত্রী সোনিয়া বেগমকে। কঠিন সময় পেরিয়ে নিজের জীবনকে নতুন করে সাজানোর পাশাপাশি তিনি এখন অন্য নারীদেরও নির্যাতন মোকাবিলায় উৎসাহিত করছেন, যা সমাজে ইতিবাচক বার্তা ছড়াচ্ছে। তার সংগ্রামের গল্প উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে।

সফল জননী হিসেবে সম্মাননা পান প্রতাপকাঠি গ্রামের মনি শংকর পালের স্ত্রী শ্যামলি রানী পাল। সন্তানদের সুশিক্ষিত ও আদর্শবান নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি পরিবার পরিচালনায় তার ধৈর্য, মমত্ববোধ ও নৈতিক ভূমিকা তাকে এই সম্মান অর্জন করতে সাহায্য করেছে। তার পরিবার স্থানীয়ভাবে ‘উদাহরণ পরিবার’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, নারী জাগরণ, অধিকার সচেতনতা ও শিক্ষার প্রসারে বেগম রোকেয়ার অবদান চিরস্মরণীয়। এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে তিনি সমাজে নারীদের জন্য যে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন, তা আজও আমাদের পথ দেখায়। বক্তারা বলেন, রোকেয়ার দেখানো পথ অনুসরণ করে এগিয়ে গেলে সমাজে নারী-পুরুষ সমতা প্রতিষ্ঠা সহজ হবে। তারা নারী শিক্ষার প্রসার, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা অর্জন এবং নারীর নেতৃত্ব বিকাশে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা আরও জোরদার করার আহ্বান জানান।

এ সময় বক্তারা বেগম রোকেয়ার জীবনী তুলে ধরে জানান, ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের পায়রাবন্দ গ্রামে জন্ম নেওয়া রোকেয়া খাঁটি দেশপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ ও মুক্তচিন্তার এক উজ্জ্বল প্রতীক। তিনি ১৯০৯ সালে ভাগলপুরে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ যা পরবর্তীকালে নারী শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। তার রচনা মতিচূর, সুলতানার স্বপ্ন, পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী নারী জাগরণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর কলকাতায় তার মৃত্যু হলেও তার আদর্শ আজও প্রজন্মকে আলোকিত করে।

মনিরামপুরে আয়োজিত এ দিবসের কর্মসূচি শুধু বেগম রোকেয়ার স্মৃতিকে স্মরণ করাই নয়, বরং সমাজে নারীর অগ্রযাত্রার গল্প, তাদের অবদান ও সংগ্রামকে সম্মান জানানোর একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিণত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথি ও নাগরিকদের অংশগ্রহণে এ আয়োজনটি নারীর ক্ষমতায়ন ও সমতার প্রতি সমাজের অঙ্গীকারকে আরও শক্তিশালীভাবে সামনে নিয়ে আসে।

এই বিভাগের আরও খবর


ধান উপদেষ্টার সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক সন্ধ্যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

নির্বাচনে কোনো ব্যত্যয় ঘটলে দেশের সার্বভৌমত্ব বিঘ্নিত হবে : দুদু

ফেসবুকে আমরা