এক হাজার শয্যার বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন চিকিৎসা নিচ্ছেন গড়ে পাঁচ হাজার রোগী। শয্যার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে গত চার মাস ধরে সরকারি বরাদ্দ না পাওয়ায় রোগীদের খাবার সরবরাহ নিয়েও দেখা দিয়েছে সংকট। ইতোমধ্যে খাবারের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে ডিম। দ্রুত বরাদ্দ না এলে আগামী মার্চ থেকে খাবার সরবরাহ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা করছেন হাসপাতাল পরিচালক।
হাসপাতাল প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে রোগীদের খাবারের জন্য সরকারি বরাদ্দ পাওয়ার কথা থাকলেও ৫ নভেম্বর পর্যন্ত কোনো অর্থ ছাড় হয়নি। অথচ প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীর খাবার সরবরাহে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতাল পরিচালকের অনুরোধে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের উদ্যোগে খাবার সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। তবে গত ১৫ অক্টোবর থেকে রোগীদের খাবারের তালিকা থেকে ডিম বাদ দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, সরকারি বরাদ্দ না আসায় ঠিকাদারকে দিয়ে আপাতত কোনোমতে খাবার সরবরাহ চালু রাখা হয়েছে। এ কারণে রোগীপ্রতি ১৫ টাকা খরচ কমানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে আবার খাবারের তালিকায় ডিম যুক্ত করা হবে। তবে আগামী মার্চের মধ্যে বরাদ্দ না এলে খাবার সরবরাহ বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না।
রোগীর চাপ পাঁচ হাজার, শয্যা মাত্র এক হাজার
বরিশাল বিভাগের ছয় জেলাসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলার মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল এই হাসপাতাল। প্রতিদিন এখানে গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। পাশাপাশি বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন দুই হাজারের বেশি মানুষ। সব মিলিয়ে দৈনিক রোগীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার।
অতিরিক্ত রোগীর চাপে ওয়ার্ডের পাশাপাশি করিডর, বারান্দা ও খোলা জায়গায় বিছানা পেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। রোগীদের জন্য খোলা জায়গায় ৯৭৮টি বেডের ব্যবস্থা করা হলেও এক হাজারের বেশি রোগীকে মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এমনকি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রেও (আইসিইউ) মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে মুমূর্ষু রোগীদের।
একজন রোগীর সঙ্গে দুই থেকে তিনজন স্বজন হাসপাতালে আসায় প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার মানুষের উপস্থিতি থাকে। এতে হাসপাতালের স্বাভাবিক পরিবেশ ও চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
ওষুধ সংকটে ব্যাহত চিকিৎসাসেবা
খাবারের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা নিয়েও রয়েছে নানা সংকট। এক্স-রে ফিল্ম ও থাইরয়েড পরীক্ষার ওষুধের অভাব রয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকায় সিটি স্ক্যানসহ বিভিন্ন পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। ক্যানসারসহ জটিল রোগের ওষুধের সংকটও দীর্ঘদিনের। এমনকি প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে জটিল অস্ত্রোপচারও ব্যাহত হচ্ছে।
হাসপাতালের প্রশাসনিক দফতর সূত্রে জানা গেছে, এক হাজার রোগীর জন্য যে পরিমাণ বরাদ্দ প্রয়োজন, সেখানে পাঁচ হাজার রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে। সরকারি বরাদ্দের অর্থ দিয়ে মাসে ১১ দিনের বেশি চলা সম্ভব হচ্ছে না।
১৩টি লিফটের আটটিই অচল
হাসপাতালের পুরোনো ও নতুন পাঁচতলা ভবনে মোট ১৩টি লিফট রয়েছে। এর মধ্যে পুরোনো ভবনের পাঁচটি এবং নতুন ভবনের তিনটি লিফট অচল। ফলে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের এক তলা থেকে অন্য তলায় নিতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে স্বজনদের। লিফটের সামনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে রোগীদের।
হাসপাতালের পরিচালক জানান, লিফট সচল করতে বারবার গণপূর্ত বিভাগকে জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।
এ বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রাশেদুজ্জামান বলেন, লিফট সচল করার জন্য বিল তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ অনুমোদনের পর দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ করে কাজ শুরু করা হবে।
হাসপাতালের আয়ও কমেছে অর্ধেক
হাসপাতালের নিজস্ব আয় কমে যাওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিচালক। তিনি বলেন, হাসপাতালে যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব, সেগুলোর অনেকগুলোই বাইরে থেকে করানো হচ্ছে। প্রতিদিন যেখানে এক হাজার ১০০ রোগীর পরীক্ষা হওয়ার কথা, সেখানে হচ্ছে মাত্র ৫০০ জনের। হাসপাতালের আয় গত বছরের তুলনায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর হাসপাতালের শৃঙ্খলা ফেরাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতার অভাবে প্রত্যাশিত উন্নতি হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।