September 15, 2026, 12:56 pm

জুলাই হত্যা মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড

জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলন দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি মো. সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনান। মামলার সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।

যেভাবে শুরু হয় বিচার

মামলাটির তদন্ত শুরু হয় ২০২৫ সালের ১৮ জুন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ওই বছরের ৭ ডিসেম্বর চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। যাচাই-বাছাই শেষে ১৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। একই দিন অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-২।

পরবর্তী সময়ে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং স্টেট ডিফেন্স নিয়োগসহ বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এরপর চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

১৭ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য এবং প্রথম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়।

তদন্ত কর্মকর্তাসহ এ মামলায় মোট ২৯ জন সাক্ষ্য দেন। তাদের মধ্যে শহীদ শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর আগে দেওয়া জবানবন্দিও রয়েছে। ২ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ হয়। এর দুই দিন পর, ৪ আগস্ট থেকে যুক্তিতর্ক শুরু করে প্রসিকিউশন। ৯ কার্যদিবস পর ১৭ আগস্ট প্রসিকিউশন ও স্টেট ডিফেন্সের যুক্তিতর্ক শেষ হয়। একই দিন মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয় এবং ১৫ সেপ্টেম্বর রায়ের দিন নির্ধারণ করা হয়।

মামলায় মোট ১২৩ সিরিজ ডকুমেন্টস প্রদর্শন করা হয়েছে।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ

প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে আসামিরা সমন্বিতভাবে নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। নেতাকর্মীদের রাজপথে নামিয়ে আন্দোলন প্রতিহত করার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি বিভিন্ন বৈঠকে সহিংসতার পরিকল্পনাও করা হয়।

অভিযোগে আরও বলা হয়, বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র হামলা, কঠোর দমন-পীড়ন এবং গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে আসামিরা ভূমিকা রাখেন। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে দেশজুড়ে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে শাস্তিযোগ্য।

ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে অভিযোগ

প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাই গণআন্দোলনের সময় ওবায়দুল কাদেরের অধীনস্থ ও নিয়ন্ত্রণাধীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ দলটির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র কর্মীরা ব্যাপক ও পদ্ধতিগতভাবে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালিয়ে হত্যা ও নির্যাতন করেন।

এসব অপরাধ ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশ, উসকানি, প্ররোচনা, সহায়তা, সম্পৃক্ততা ও জ্ঞাতসারে সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

বাহাউদ্দিন নাছিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ

আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তার অধীনস্থ ও নিয়ন্ত্রণাধীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র বাহিনী নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর ব্যাপক ও পদ্ধতিগত হামলা চালায়।

প্রসিকিউশনের দাবি, তার নির্দেশ, উসকানি, প্ররোচনা, সহায়তা ও সম্পৃক্ততায় এসব হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনা সংঘটিত হয়।

মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিরুদ্ধে অভিযোগ

মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, তার অধীনস্থ ও নিয়ন্ত্রণাধীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সশস্ত্র কর্মীরা জুলাই গণআন্দোলনের সময় নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালিয়ে হত্যা ও নির্যাতন করেন।

এসব কর্মকাণ্ডে তার নির্দেশ, উসকানি, প্ররোচনা, সহায়তা ও জ্ঞাতসারে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে।

যুবলীগের দুই নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ

শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের অধীনস্থ ও নিয়ন্ত্রণাধীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং যুবলীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র কর্মীরা আন্দোলনরত নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর ব্যাপক ও পদ্ধতিগত হামলা চালায়।

প্রসিকিউশনের দাবি, তাদের নির্দেশ, উসকানি, প্ররোচনা, সহায়তা ও সম্পৃক্ততায় হত্যা ও নির্যাতনের এসব ঘটনা ঘটে।

ছাত্রলীগের দুই নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ

ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের অধীনস্থ ও নিয়ন্ত্রণাধীন ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র কর্মীরা সারাদেশে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালিয়ে হত্যা ও নির্যাতন করেন।

প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, আসামিদের নির্দেশ, উসকানি, প্ররোচনা, সহায়তা, সম্পৃক্ততা ও জ্ঞাতসারে এসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ

প্রসিকিউশনের দাবি, উপর্যুক্ত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আসামিরা হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নির্যাতন ও অন্যান্য অমানবিক আচরণ, অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা ও উসকানি, ষড়যন্ত্র এবং অপরাধ সংঘটনে সম্পৃক্ততার মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। পাশাপাশি অপরাধ সংঘটন প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে আনা হয়।

এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে শাস্তিযোগ্য বলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা