এস এম জহিরুল ইসলাম বিদ্যুৎ:
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বুধবারের গণশুনানি যেন পরিণত হয়েছিল অসহায় মানুষের কান্না, বেদনা ও আশার এক মানবিক মিলনমেলায়। চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে না পারা রোগী, দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব বরণ করা মানুষ, পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে দিশেহারা নারী—সবার শেষ আশ্রয় হয়ে দাঁড়ালেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
বুধবার, ১৩ মে অনুষ্ঠিত এ গণশুনানিতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ও মহানগর এলাকা থেকে আসা ৩৬ জন সেবাপ্রত্যাশীর কথা ধৈর্যের সঙ্গে শোনেন জেলা প্রশাসক। অনেকের আবেদন শুনে তাৎক্ষণিক সহায়তা ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন তিনি।
মিরসরাইয়ের মধ্যম তালবাড়ীয়া এলাকার ৫৩ বছর বয়সী বেলাল হোসেন জানান, ২০২৩ সালে রাস্তার পাশে সবজি বিক্রির সময় বাস ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে তার বাম পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর থেকে তিনি প্রায় কর্মক্ষমতা হারিয়ে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আবেগাপ্লুত হয়ে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন তিনি।
আকবরশাহ এলাকার রেহানা বেগম অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা ব্যয় বহনে অক্ষমতার কথা জানান। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, খরচ জোগাড় করতে না পেরে পরিবারটি দিশেহারা।
পাহাড়তলীর চেয়ারম্যান কলোনির ভাড়া বাসায় বসবাসকারী পঙ্গু ওয়াসিম সরকার জানান, সংসারে তাকে দেখভাল করার মতো কেউ নেই। নিজের ভরণপোষণ চালানোও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
রাউজানের উত্তর সর্তা হলদিয়া এলাকার স্মৃতি রুদ্র জানান, চার বছর আগে বাবাকে হারানোর পর বড় মেয়ে হিসেবে পুরো পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে। এখন দ্বিতীয় বোনের বিয়ের আয়োজন করতে গিয়ে চরম অর্থসংকটে পড়ে সহায়তা চান তিনি।
মিরসরাইয়ের তাসলিমা আক্তার দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। রিকশাচালক স্বামীর সীমিত আয়ে চিকিৎসা ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। একই দিনে নিজামপুর কলেজের ডিগ্রি তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী লেখাপড়া ও ফরম পূরণের খরচের জন্য সহায়তা চান।
গণশুনানিতে আসা এসব আবেদন মনোযোগ দিয়ে শুনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দেন জেলা প্রশাসক। এসময় গুরুতর অসুস্থ ছয়জন ব্যক্তি ও এক শিক্ষার্থীকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। পাশাপাশি এক দুস্থ নারীকে চাল, ডাল, তেল, চিনি, লবণ, মরিচ, হলুদ ও ধনিয়া গুঁড়াসহ ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্র জানায়, অনেক সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান করা হয়। কিছু বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে আবেদনকারীকে ফলাফল জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
গণশুনানি শেষে অনেক সেবাপ্রত্যাশীকেই জেলা প্রশাসকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে দেখা যায়। তাদের ভাষায়, “সরকারি অফিসে এসে এত মানবিক আচরণ আগে পাইনি।”
সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক গণশুনানি, অসুস্থ রোগীদের পাশে দাঁড়ানো, কারাবন্দিদের পুনর্বাসনে উদ্যোগ এবং দরিদ্র মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসার কারণে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ইতোমধ্যেই সাধারণ মানুষের কাছে “মানবিক ডিসি” হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।