ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া-নগরপাড়া এলাকার বালু নদে সেতুর নির্মাণকাজ ২৩ বছরেও শেষ হয়নি। বহু প্রত্যাশিত বালু ব্রিজ নামে পরিচিত এ সেতু ২০০৩ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তখন ৭৫ দশমিক ৩০ মিটার দৈর্ঘ্যরে সড়ক ও জনপথ (সওজ) এর বালু নদের এ সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা। সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার দাবিতে এলাকাবাসী বিভিন্ন সময়ে সভা, সমাবেশ, বিক্ষোভ, মানববন্ধন, সড়ক অবরোধসহ নানা ধরণের কর্মসূচি পালন করেছে। কিন্তু কোনো সুফল হয়নি।
তাতে আবারো আন্দোলন সংগ্রামে ফুঁসে উঠছে এলাকাবাসী।
গত ২৭মার্চ সড়ক পরিবহন ও সেতু প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ ও বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী মনিরুজ্জামান বালু নদের সেতু পরিদর্শন করেন।
গত ১৬এপ্রিল জাতীয় সংসদে নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া দিপু বলেন, ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিশ্রুতিতে দরপত্রের মাধ্যমে ২০০৩ সালে বালু নদের সেতু নির্মাণ কাজ শুরু হয়।
একপর্যায়ে বিভিন্ন মহলের মাধ্যমে সেতু নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বন্ধ করে দেওয়া সেই সেতু নির্মাণ কাজ যেন দ্রুত শেষ হয় তিনি জাতীয় সংসদে দাবি জানান। সেতুটি নির্মাণ হলে ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা- চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট নিরসন হবে। রূপগঞ্জবাসীও উপকৃত হবে বলে তিনি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সেতুর দুইটি পিয়ার, দুইটি পিয়ারের কলাম, ক্যাপ, এক পাশে উইংওয়াল ও এবার্টমেন্ট দেওয়াল দাঁড়িয়ে আছে। সেতুর সংযোগ সড়কের বেহাল দশা। ঐ সড়কের সলিং করা ইট উঠে গেছে। ব্যবহৃত রডে মরিচা ধরেছে। বালু সেতু নির্মাণ হলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার সেতুবন্ধন তৈরি হতো। কমে যেত রাজধানী ঢাকার যানজট আর দূরত্ব। একটি মাত্র সেতুর জন্য রূপগঞ্জসহ আশপাশের লাখো মানুষকে ১২-১৩ কিলোমিটার পথ ঘুরে রাজধানী ঢাকায় যেতে হয়। সেতুটি নিয়ে দুই দফায় টেন্ডারও হয়েছে। সেতুটিকে ঘিরে লাখো মানুষ বুকভরা আশা আর স্বপ্ন নিয়ে আছেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন বার বার ভেঙে যাচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগের অধীনে মাঝিনা-কায়েতপাড়া-ত্রিমোহনী সড়কের বালু নদের ওপর সেতু নির্মাণের দরপত্র ২০০১ সালে আহ্বান করা হয়। সেতু নির্মাণে মেসার্স ইষ্টার্ন ট্রেডার্স লিমিটেড দায়িত্ব পায়। সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্ত্বাবধানে এক বছরের মধ্যে সেতুটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার কথা ছিল।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক জাহিদ হোসেন বলেন, সিতু নির্মাণে ২০০৪-২০০৫ অর্থবছরে মত্র ৫০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। এরপর আর কোন বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। টাকাও উত্তোলন করা যায়নি। শিডিউল অনুযায়ী সিমেন্ট, রড, বালু, পাথরসহ নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় একপর্যায়ে নির্মাণ কাজে স্থবিরতা নেমে আসে। এ রকম নানা প্রতিকুলতায় বালু সেতু নির্মাণকাজ ২৩ বছরেও শেষ হয়নি। বর্তমানে সেতুর দুইটি পিয়ার, পিয়ার কলাম, এক দিকের এবার্টমেন্ট ও উইংওয়াল নির্মাণের পর সেতুর নির্মাণকাজ থমকে যায়।
২০২১ সালে অসমাপ্ত বালু সেতু নির্মাণে দ্বিতীয় দফায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। এসময় নতুন করে বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রায় ১৩ কোটি টাকা। তখন মেসার্স ইউনুস অ্যান্ড বাদ্রার্স এবং মেসার্স সরদার এন্টারপ্রাইজ (জেভি) সেতু নির্মাণের কাজ পায়। সে অনুযায়ী ২০২১ সালের মে মাসে কাজ শুরু করার কথাও ছিল। অজ্ঞাত কারণে দ্বিতীয় দফায় সেতুর নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে যায়। বালু সেতুটি নির্মাণ হলে রূপগঞ্জসহ রাজধানী ঢাকার উপকন্ঠের খিলগাঁও, সবুজবাগ, ডেমরা ও আশপাশের কয়েক লাখ মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যাবে। খুলে যাবে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। তৈরি হবে নতুন নতুন শিল্পকারখানা ও গার্মেন্টশিল্প। সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থানের। সেতুটি নির্মিত হলে কাঁচপুর ও সুলতানা কামাল সেতুর যানজট কমে যাবে।
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল সিলেট, ভৈরব, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদীসহ ১০ জেলার যানবাহন অতি সহজে ভুলতা দিয়ে কায়েতপাড়া হয়ে রাজধানী রামপুরায় প্রবেশ করতে পারবে।
কায়েতপাড়ার ইউনিয়নের ইছাখালী গ্রামের বাসিন্দা ও পৈতৃক ভিটা-মাটি সংরক্ষণ পরিষদের আহবায়ক মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ বলেন, সরকার যায়, সরকার আসে। এমনি করে ২৩বছর পার হয়ে গেলেও বালু নদের সেতু নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। অবিলম্বে সেতু নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা উচিত।
নারায়ণগঞ্জ জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী (সওজ) আবদুর রহিম বলেন, কায়েতপাড়া-নগরপাড়া এলাকার বালু নদের সেতু নির্মাণ খুবই জরুরি। সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে শিগগিরই সেতু নির্মাণকাজ শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া দিপু বলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ বালু নদের সেতু নির্মাণে নতুন উদ্যমে পরিকল্পনা হচ্ছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, ঢাকার পূর্ব মাদারটেক, সবুজবাগ হয়ে বালু নদের সেতু পার হয়ে সিলেট ও চট্টগ্রামসহ ঢাকার পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় সহজেই আসা-যাওয়া করা যাবে। সেই দিক থেকে বালু নদের সেতুটি অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ। বালু নদের সেতু নির্মাণ কাজ দ্রুত সমাপ্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি :