নিজস্ব প্রতিবেদক:
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বাজারের ব্যবসায়ী শীতল সাধুর করা দুটি পৃথক আর্থিক দাবিকে কেন্দ্র করে অর্থের উৎস, আর্থিক সক্ষমতা এবং কথিত ঋণ লেনদেনের বাস্তবতা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ডুমুরিয়া থানায় দেওয়া একটি লিখিত অভিযোগে তিনি প্ররাজীত কুমার মজুমদার (সনজিৎ মজুমদার)-এর কাছে ২৫ লাখ টাকা পাওনার দাবি করেছেন। অন্যদিকে সনজিৎ মজুমদারের স্ত্রী পূর্ণিমা হালদারের কাছে পাঠানো একটি লিগ্যাল নোটিশে ৪৫ লাখ টাকা দাবির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে একই পরিবারের দুই সদস্যকে ঘিরে মোট ৭০ লাখ টাকার আর্থিক দাবির পেছনে প্রকৃত আর্থিক ভিত্তি, অর্থের উৎস এবং কথিত লেনদেনের বাস্তবতা নিয়ে অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ডুমুরিয়া থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে শীতল সাধু দাবি করেন, ১২ আগস্ট ২০২৬ তারিখে তিনি সনজিৎ মজুমদারকে ২৫ লাখ টাকা ধার দেন। অভিযোগে বলা হয়, ওই অর্থ পাঁচ দিনের মধ্যে ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময় পার হলেও টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে পাওনা টাকা চাওয়ার পর ২২ আগস্ট বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দোকানে গিয়ে টাকা ফেরত চান বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। এ সময় তাকে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়, পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি টাকা পরিশোধ না করে অজ্ঞাত স্থানে অবস্থান নেন। এসব বক্তব্য অবশ্য অভিযোগকারীর নিজস্ব দাবি; তদন্ত বা আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়ার আগে এগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে সনজিৎ মজুমদারের স্ত্রী পূর্ণিমা হালদারের কাছে আইনজীবীর মাধ্যমে পাঠানো পৃথক একটি লিগ্যাল নোটিশে ৪৫ লাখ টাকার আর্থিক দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। নোটিশে কথিত অর্থ পরিশোধের জন্য ৪৫ লাখ টাকার একটি চেক দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে এবং পরে চেকটি ব্যাংকে উপস্থাপন করা হলে অপর্যাপ্ত তহবিলের কারণে ফেরত আসে বলে দাবি করা হয়েছে।
এখানেই তৈরি হয়েছে অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একদিকে সনজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে ২৫ লাখ টাকা পাওনার অভিযোগ, অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী পূর্ণিমা হালদারের কাছে ৪৫ লাখ টাকার লিগ্যাল নোটিশ—দুটি দাবির মধ্যে প্রকৃত সম্পর্ক কী? এগুলো কি সম্পূর্ণ পৃথক দুটি আর্থিক লেনদেন, নাকি কোনোভাবে একই আর্থিক লেনদেন বা দায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত? যদি পৃথক লেনদেন হয়, তাহলে উভয় দাবির অর্থের উৎস ও লেনদেনের নথি কী? আর যদি কোনো সম্পর্ক থাকে, তাহলে সেই সম্পর্কের ভিত্তি কী?
দুই দাবির অঙ্ক যোগ করলে মোট ৭০ লাখ টাকা দাঁড়ায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—এই ৭০ লাখ টাকা কি একই সময়ে বা কাছাকাছি সময়ে শীতল সাধুর হাতে থাকা বৈধ অর্থ থেকে দেওয়া হয়েছিল? অর্থের উৎস কি ব্যবসায়িক আয়, ব্যক্তিগত সঞ্চয়, ব্যাংক থেকে উত্তোলন, সম্পদ বিক্রি কিংবা অন্য কোনো বৈধ উৎস? নাকি দুটি দাবির অর্থের উৎস ছিল সম্পূর্ণ আলাদা?
বিশেষ করে ২৫ লাখ টাকার অভিযোগে যদি নগদ অর্থ দেওয়ার দাবি করা হয়ে থাকে, তাহলে ওই অর্থের উৎস ও হস্তান্তরের প্রমাণ যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব ও উত্তোলনের রেকর্ডে তার প্রতিফলন থাকার কথা। ব্যবসায়িক আয় থেকে অর্থ দেওয়া হয়ে থাকলে ব্যবসার হিসাববই, নগদ বই, বিক্রয় রেজিস্টার কিংবা সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথিতে তার প্রতিফলন থাকার কথা। ব্যক্তিগত সঞ্চয়, সম্পদ বিক্রি বা অন্য কোনো বৈধ উৎস থেকে অর্থের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকলে সেই উৎসেরও নথি থাকার কথা।
একইভাবে পূর্ণিমা হালদারের কাছে দাবিকৃত ৪৫ লাখ টাকার ক্ষেত্রেও অর্থের প্রকৃত উৎস, লেনদেনের পদ্ধতি এবং চেকের পেছনে থাকা আর্থিক দায় যাচাই করা প্রয়োজন। চেকটি কেন দেওয়া হয়েছিল, তার বিপরীতে প্রকৃত অর্থনৈতিক দায় কত ছিল এবং ওই দাবির পক্ষে কী ধরনের লিখিত বা ব্যাংকিং প্রমাণ রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর নথিপত্র থেকেই পাওয়ার কথা।
এখানে অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানেই অর্থ অবৈধ—এমন কোনো সিদ্ধান্ত নয়। বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস, আর্থিক সক্ষমতা এবং লেনদেনের বাস্তবতা যাচাই করা স্বাভাবিক অনুসন্ধানী প্রক্রিয়া। বিশেষ করে একই পরিবারের দুই সদস্যকে ঘিরে পৃথকভাবে মোট ৭০ লাখ টাকার আর্থিক দাবি সামনে এলে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
লিগ্যাল নোটিশে উল্লেখিত চেক ডিজঅনারের বিষয়টিও আলাদাভাবে যাচাইযোগ্য। Negotiable Instruments Act, 1881-এর ১৩৮ ধারায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে অপর্যাপ্ত তহবিলের কারণে চেক ফেরত যাওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে কোনো চেক ডিজঅনার হয়েছে কি না এবং চেকটির পেছনে প্রকৃত আর্থিক দায় কত ছিল—এ দুটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। চেকের অস্তিত্ব একাই ৪৫ লাখ টাকার দাবির পূর্ণ আর্থিক ভিত্তি ব্যাখ্যা করে না।
এদিকে চুকনগর বাজার ও আশপাশের এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আর্থিক লেনদেন ও পাওনা-দেনা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শীতল সাধুকে ঘিরে অতীতেও স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে নানা আলোচনা ছিল। তবে এসব আলোচনার পক্ষে কোনো লিখিত অভিযোগ, আদালতের নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে নেই। ফলে এসব আলোচনা থেকে শীতল সাধুর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ বা অনিয়মের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বরং বিষয়গুলো যাচাইযোগ্য তথ্য ও নথির ভিত্তিতে পর্যালোচনা করাই সমীচীন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান ঘটনার প্রকৃত চিত্র বের করতে হলে প্রথমেই যাচাই করা প্রয়োজন—২৫ লাখ টাকা সনজিৎ মজুমদারকে বাস্তবে দেওয়া হয়েছিল কি না, দেওয়া হয়ে থাকলে কীভাবে দেওয়া হয়েছিল, সেই অর্থের উৎস কী ছিল এবং এর পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে। একইভাবে পূর্ণিমা হালদারের কাছে দাবিকৃত ৪৫ লাখ টাকার প্রকৃত ভিত্তি, চেক প্রদানের কারণ, চেকের ব্যাংক রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তদন্তে ব্যাংক হিসাব, অর্থ উত্তোলনের রেকর্ড, চেকের মূল কপি, ব্যাংকের রিটার্ন মেমো, ব্যবসায়িক হিসাববই, আয়কর বা অন্যান্য আর্থিক নথি, লিখিত চুক্তি বা রসিদ এবং সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে শীতল সাধু, সনজিৎ মজুমদার এবং পূর্ণিমা হালদার—তিন পক্ষের বক্তব্যই গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে কোনো একটি পক্ষের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে পুরো ঘটনাকে মূল্যায়ন করতে না হয়।
কারণ থানায় দেওয়া অভিযোগ ও আইনজীবীর মাধ্যমে পাঠানো লিগ্যাল নোটিশে থাকা বক্তব্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি মাত্র। আদালত বা যথাযথ তদন্তে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এসব দাবিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়। একইভাবে কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া প্রতারণা, তঞ্চকতা বা অন্য কোনো অপরাধের অভিযোগ আরোপ করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তবে একই পরিবারের দুই সদস্যকে ঘিরে ২৫ লাখ ও ৪৫ লাখ—মোট ৭০ লাখ টাকার পৃথক আর্থিক দাবি সামনে আসায় বিষয়টির নথিভিত্তিক অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রকৃতপক্ষে কত টাকা লেনদেন হয়েছিল, কার কাছে কত টাকা দেওয়া হয়েছিল, অর্থের উৎস কী ছিল, দুটি দাবির মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না এবং দাবিকৃত অর্থের পক্ষে কী ধরনের নথিভিত্তিক প্রমাণ রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তরই পুরো ঘটনার আর্থিক বাস্তবতা স্পষ্ট করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত বক্তব্যের চেয়ে ব্যাংক ও আর্থিক নথিই নির্ধারণ করতে পারে কথিত লেনদেনের প্রকৃত চিত্র। তাই ৭০ লাখ টাকার এই দাবির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্যের পাশাপাশি অর্থের উৎস, লেনদেনের রেকর্ড এবং দাবির পেছনের নথিপত্র নিরপেক্ষভাবে যাচাই করাই হবে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ।