June 16, 2026, 6:17 pm

নদী খননের মাটি জমায় ডুমুরিয়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের চরম দুর্ভোগ

ডুমুরিয়া (খুলনা) প্রতিনিধি :
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা নদী খননের মাটি ফেলার কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘরের পেছনে বিশাল মাটির স্তূপ জমে টয়লেট, রান্নাঘর ও সামগ্রিক বসবাসের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুরোপুরি ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় ভুক্তভোগী ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, যশোর-ভবদহ ও খুলনা অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে ভদ্রাসহ ছয়টি নদীর প্রায় ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার এলাকায় খননকাজ চলছে, যা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের আওতায় চুকনগর থেকে বরাতিয়া পর্যন্ত ভদ্রা নদীর তীরবর্তী এলাকায় প্রায় ৪০০টি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর রয়েছে। কিন্তু নদী খননের বিপুল পরিমাণ মাটি ঘরের পেছনে স্তূপ করে রাখায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের বহু নিম্নআয়ের পরিবার বর্তমানে দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের আকুতি ও ক্ষোভ
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা তপতি দাস ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “ঘরের পেছনে মাটি চাপা দেওয়ার পর থেকে আমরা খুব কষ্টে আছি। টয়লেটের ট্যাংকি মাটিতে ভরে যাওয়ায় সেগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। রান্নার স্বাভাবিক ব্যবস্থা না থাকায় বাইরে ইট বসিয়ে কোনোমতে রান্না করতে হচ্ছে। বৃষ্টি হলে সেই সুযোগও থাকে না। সন্তানদের ঠিকমতো খাবার দিতে পারছি না, গরমে পরিবারের সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ছে।”
একই প্রকল্পের বাসিন্দা মুন্নি বেগম জানান, মাটির প্রচণ্ড চাপে তাদের রান্নাঘর, টিনের কাঠামো ও বাথরুম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোনো উপায় না দেখে কয়েকদিন ধরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিজেরাই মাটি সরানোর চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, “আমার স্বামী অসুস্থ। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে শ্রমিক নিয়োগ করার ক্ষমতাও নেই। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্ট করে মাটি অপসারণ করতে হচ্ছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নদী খননের কাজ শুরু হয়। প্রথম দিকে কাজ স্বাভাবিকভাবে চললেও সম্প্রতি বিপুল পরিমাণ মাটি ফেলার কারণে অনেক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাটির চাপে দেয়াল ফেটে গেছে, টয়লেটের ট্যাংকি নষ্ট হয়েছে এবং ভারী যন্ত্র দিয়ে মাটি সরানোর সময় ঘরগুলো কেঁপে ওঠে।
বেবি বেগম ও চামেলী দাস নামের অন্য বাসিন্দারা জানান, ঘরের টিনের চাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একদিকে রান্না ও টয়লেট ব্যবহারের অনুপযোগী পরিবেশ, অন্যদিকে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় প্রচণ্ড গরমে শিশু ও অসুস্থদের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে পড়েছে। শিশুরা স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনাও করতে পারছে না।
জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বক্তব্য
ডুমুরিয়ার আটলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ‌শেখ হেলাল উদ্দিন জানান, বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে মোট ১২৫টি ঘর রয়েছে, যার মধ্যে ১০টি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলোর মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এতে সার্বিক সহযোগিতা করছে। গত দুই দিনে অধিকাংশ মাটি অপসারণ করা হয়েছে এবং বর্তমানে ঘরগুলো ঝুঁকিমুক্ত অবস্থায় রয়েছে।
গত ১৪ জুন বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশের পর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এরপরই আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোর পেছনে জমে থাকা মাটি দ্রুত অপসারণের কাজ শুরু হয়।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন খুলনার জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাতসহ উপজেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক সাংবাদিকদের বলেন, “যশোর-ভবদহ ও খুলনা অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে ভদ্রাসহ কয়েকটি নদী খননের কাজ চলছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে কিছু উপকারভোগী ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আমরা পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যালোচনা করতে এসেছি। নদী খননের ফলে যাদের ক্ষতি হয়েছে, তা দ্রুত পুষিয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা