গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘গাজায় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত না হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কি শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি দেখবে?’
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন ম্যাক্রোঁ। একই মঞ্চে ট্রাম্প তার গাজা শান্তি পরিকল্পনাকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরার কয়েক ঘণ্টা পর ফরাসি প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য আসে।
ম্যাক্রোঁ বলেন, কেউ কেউ কথিত শান্তির কথা বলছেন। কিন্তু সেই শান্তি গাজায় এক সেকেন্ডের জন্যও মানবিক প্রবেশাধিকার পুনরায় চালু করতে পারেনি। এরপর তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দেন, আমরা কি শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এমন একটি দৃশ্য দেখব, যা আমাদের সবার জন্য লজ্জার?
জাতিসংঘের মঞ্চে নিজের শেষ ভাষণে গাজার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করেন তিনি। এক বছর আগে একই মঞ্চে প্রায় এক ডজন দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তখন অনেকে বলেছিলেন, স্বীকৃতি শুধু কাগজের টুকরো। কিন্তু গাজার পরিস্থিতিতে নিষ্ক্রিয় থাকলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে বলে সতর্ক করেন ম্যাক্রোঁ।
গাজার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন তিনি। সেখানে প্রতিদিন নানা ধরনের লঙ্ঘন ঘটছে বলে মন্তব্য করেন ম্যাক্রোঁ। ‘এসব কর্মকাণ্ড কার নামে করা হচ্ছে? হামাস তো কখনো পশ্চিম তীরে কার্যক্রম পরিচালনা করেনি’,এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি। পশ্চিম তীরের চলমান পরিস্থিতি ফিলিস্তিনিদের বৈধ অস্তিত্বের অধিকারকে সম্মান করে কোনো রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাকে প্রতিদিন আরও কঠিন করে তুলছে বলেও জানান ফরাসি প্রেসিডেন্ট।
গত এক বছরে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিষয়ে ফ্রান্স তার অবস্থান কঠোর করেছে। দেশটি কিছু জাতীয় নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্য নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে।
ইসরায়েলের সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্ক গত এক বছরে বেশ টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। ম্যাক্রোঁ বলেন, ইসরায়েলের প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করলেই দেশটির নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এমন ধারণা ভুল। বরং এ ধরনের কর্মকাণ্ড ইসরায়েলের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাকে দুর্বল করছে।
ম্যাক্রোঁর সমালোচনার জবাবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি ট্রাম্পের গাজা নীতির পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প ইসরায়েল ও হামাসের যুদ্ধ শেষ করেছেন, জীবিত সব জিম্মিকে মুক্ত করেছেন এবং নিহত জিম্মিদের মরদেহ স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি গাজায় ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নেতৃত্বও তিনি দিচ্ছেন বলে দাবি করেন হোয়াইট হাউস। তাদের ভাষ্য, অন্যরা যখন শুধু কথা বলছে, তখন ট্রাম্প জটিল এই সংকট সরাসরি মোকাবিলা করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য তার মতো আর কেউ এত বেশি কাজ করেননি বলেও দাবি করা হয়।
২০১৭ সালে প্রথম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বক্তব্য দিয়েছিলেন ম্যাক্রোঁ। আগামী বছরের মে মাসে তার বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। ফলে মঙ্গলবারের ভাষণটি ছিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তাঁর শেষ বক্তব্য।
ভাষণে তিনি বিশ্বে শক্তি ও জবরদস্তির ওপর নির্ভরশীল নতুন ব্যবস্থা গড়ে ওঠার বিষয়ে সতর্ক করেন। তার মতে, বিশ্বকে এমন একটি ব্যবস্থা বেছে নিতে হবে, যেখানে ক্ষমতার বদলে একটি ‘সভ্য আন্তর্জাতিক সমাজ’ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি হবে। ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি, জাতিসংঘের পাশে দাঁড়ানো। কেউ কেউ যে দায়মুক্তির নতুন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চান, আমরা তা মেনে নিতে পারি না।’
ভাষণের শেষে জাতিসংঘের প্রতি নিজের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘ দীর্ঘজীবী হোক।’