July 12, 2026, 7:18 pm

স্বদেশের টানে শেখ হাসিনা: ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তন কি রাজনীতির নতুন দিগন্ত

মানিক লাল ঘোষ :

​বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক অভূপূর্ব সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। চারপাশের ঘটনাপ্রবাহ আর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনামে বারবার একটি নামই ঘুরেফিরে আসছে—শেখ হাসিনা। নির্বাসিত জীবন থেকে তার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথকে এক নতুন মেরুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। এটি কেবল তার ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতির হারানো ছন্দ পুনরুদ্ধারের একটি সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন তার সমর্থকরা।
​সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ দীর্ঘ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা অকুতোভয়ে ঘোষণা করেছেন, “তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি মেরেও ফেলতে পারে—তবুও আমাকে যেতেই হবে।” তার এই বক্তব্য কেবল আবেগপ্রবণ নয়, বরং এক অনড় রাজনৈতিক দৃঢ়তার প্রতিফলন। যেখানে তার দলের নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন চলছে, সেখানে হাল ধরে তাদের পাশে দাঁড়ানোই একজন নেত্রীর পরম দায়িত্ব—এই বোধ থেকেই তিনি দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। “যদি মৃত্যু আসে, তবে আমি তা নিজ মাটিতেই বরণ করতে চাই, যেখানে আমার বাবা-মা শায়িত আছেন”—রয়টার্সের কাছে তার এই কালজয়ী মন্তব্য প্রমাণ করে, মাটি ও মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা কোনো ভয় বা প্রলোভনের ঊর্ধ্বে। শোনা যাচ্ছে, আইনি লড়াইয়ের জন্য তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী এক আন্তর্জাতিক আইনজীবী প্যানেল প্রস্তুত করছেন, যা তার প্রত্যাবর্তনের আইনি ভিত্তি ও নৈতিক অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে।
​অবশ্যই, এই ঘোষণার পর রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ থেকে নানা রকম নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া আসছে। বিএনপি ও সমমনা দলগুলো আইনি প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়ে তার ফিরে আসাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। কিন্তু রাজনীতির বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, শেখ হাসিনা যখন স্বেচ্ছায় আদালতের মুখোমুখি হতে চাচ্ছেন, তখন সেই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা বা তার আগমন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা প্রকারান্তরে গণতান্ত্রিক অধিকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
​মাঠের রাজনীতির এই উত্তাপের বাইরেও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটি এখন বেশ গুরুত্ব বহন করে। সম্প্রতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন ইস্যুতে অন্য কোন দেশের হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না চীন ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এর এমন বক্তব্য ও তার
​ কয়েকদিন আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই সফর এবং বেইজিংয়ের সাথে গভীর কৌশলগত সম্পর্ককে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা সতর্ক দৃষ্টিতে দেখছে। বিশেষ করে, তিস্তা প্রকল্পসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে চীনের অংশগ্রহণ ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেছে। একইভাবে, বেইজিংয়ের সাথে ঢাকার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা ভারত ও আমেরিকার প্রভাব বলয়ে থাকা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
​এই জটিল পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার মতো একজন অভিজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নেত্রীর উপস্থিতি রাজনীতিতে নতুন এক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারে বলে মনে করেন অনেক পর্যবেক্ষক। তার ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতির স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন এক সম্ভাবনা তৈরির সুযোগ হতে পারে। তার এই ফিরে আসা কেবল তার দলের জন্যই নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। মাঠের খেলোয়াড়রা যাই বলুক, শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায়বিচারের ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশের রাজনীতির পরবর্তী সমীকরণ নির্ধারিত হবে।
​শেখ হাসিনার এই দুর্দান্ত সাহসী সিদ্ধান্ত কি পারবে রাজনীতির এই মেঘাচ্ছন্ন আকাশ সরিয়ে নতুন ভোরের সূচনা করতে? ডিসেম্বরের সেই প্রতীক্ষার প্রহর এখন বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনীতি সচেতন মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে।

​(মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি)

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা