May 4, 2026, 11:33 am

বাংলাদেশকে মানতে হবে ১৩১ শর্ত, যুক্তরাষ্ট্রকে ৬

প্রথম আলো

‘বাংলাদেশকে মানতে হবে ১৩১ শর্ত, যুক্তরাষ্ট্রকে ৬’-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিতে বাংলাদেশের ওপর একতরফাভাবে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। সে তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রকে তেমন কিছুই করতে হবে না।

কোনো আইনে বা চুক্তিতে ইংরেজি ‘শ্যাল’ কথা থাকা অর্থ হচ্ছে এসব বিষয় পালন করা বাধ্যতামূলক। ‘উইল’ লেখা থাকলে সেটা হবে ইচ্ছাধীন বিষয়। ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে শ্যাল কথাটি আছে মোট ১৭৯ বার, উইল ৩ বার। এর মধ্যে ‘বাংলাদেশ শ্যাল’ এসেছে ১৩১ বার, আর ‘ইউএস শ্যাল’ আছে মাত্র ৬ বার।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি) সই হয় গত ৯ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে। পরে ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এই পাল্টা বা পারস্পরিক শুল্ক আরোপ বাতিল করে দেন।

এই চুক্তি নিয়ে দেশে নানা ধরনের সমালোচনা হচ্ছে। জাতীয় সংসদে এই চুক্তি বাতিল চেয়েছেন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন থেকেও চুক্তি বাতিলের দাবি উঠেছে। অর্থনীতিবিদেরাও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য সমাধানের কথা বলেছেন। চুক্তিটি এখনো কার্যকর হয়নি। তবে এরই মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে নানা পণ্য কেনার চুক্তি করছে। এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

মূল চুক্তিতে যা যা আছে

মূল চুক্তিতে ৬টি ধারা রয়েছে। তবে চুক্তিটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তার উল্লেখ রয়েছে পরিশিষ্টে। পরিশিষ্টে দেওয়া সব সংযুক্তি চুক্তিরই অংশ।

চুক্তির প্রথম ধারার বিষয় শুল্ক ও কোটা। এ বিষয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর নির্ধারিত শুল্ক বসাবে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে কোটা দেবে না এবং যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের পণ্যের ওপর নির্ধারিত হারে শুল্ক বসাবে।

অশুল্ক বাধা ও সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ধারায় ১১টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এর মূল কথা হলো মার্কিন পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড়াও এমন কোনো নিয়ম, কাগজপত্র, অনুমতি, পরীক্ষা, মান যাচাই বা লাইসেন্স আরোপের মতো নিয়ম করা যাবে না, যা বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করবে। যেমন বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর আমদানি লাইসেন্স প্রয়োগ করবে না, যুক্তরাষ্ট্রের যেসব পণ্য মার্কিন বা আন্তর্জাতিক মান মেনে চলে, সেসব পণ্য বাংলাদেশে ঢুকতে পারবে এবং সরকারি বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার থেকে সনদ দেওয়া থাকলে বাংলাদেশ অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করবে না।

চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের জন্য বাংলাদেশি বাজারে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা আছে। তবে স্বাস্থ্য বা নিরাপত্তার কারণে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে তা বিজ্ঞানভিত্তিক ও ঝুঁকিভিত্তিক হতে হবে, শুধু বাণিজ্য ঠেকানোর জন্য নিয়ম করা যাবে না। বাংলাদেশ এমন কোনো স্বাস্থ্যবিধি বা মানদণ্ড নেবে না, যাতে মার্কিন পণ্য অন্য দেশের তুলনায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। জিআই সুরক্ষা বা স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

চুক্তির পরের অংশে চিজ ও মাংসজাত পণ্যের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, কেবল নাম ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের বাজারে প্রবেশে বাধা দেবে না।

বাংলাদেশ মেধাস্বত্বের শক্ত সুরক্ষা দেবে। মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন ঠেকাতে দেওয়ানি, ফৌজদারি ও সীমান্ত পর্যায়ে ব্যবস্থা নেবে, অনলাইন ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হবে। কপিরাইট ও ট্রেডমার্ক লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।

সেবা খাত নিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন নিয়ম করতে পারবে না, যাতে মার্কিন সেবাপ্রতিষ্ঠান দেশীয় বা অন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কম সুবিধা পায়। বাণিজ্য-সংক্রান্ত নতুন নিয়ম করার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখতে হবে এবং আলোচনা ছাড়া হঠাৎ কোনো বিধি চাপানো যাবে না।

এর পরের অনুচ্ছেদ শ্রম নিয়ে। এখানে বলা হয়েছে যে জোরপূর্বক বানানো কোনো পণ্য আমদানি করা যাবে না। এর মধ্যে রয়েছে শিশুশ্রম, চুক্তিবদ্ধ বাধ্যতামূলক বা জোরপূর্বক শ্রম। পরিবেশ সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ ও বজায় রাখার কথা আছে এরপরেই। পরের অনুচ্ছেদটি সীমান্তব্যবস্থা ও কর বিষয়ে। যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেদের শ্রমিক ও ব্যবসা রক্ষায় সীমান্তে কোনো নিয়ম নেয়, বাংলাদেশ সেই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিল রেখে কাজ করবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজের রপ্তানিকারকদের কর ছাড় দেয় বা কর ফেরত দেয়, বাংলাদেশ তার বিরোধিতা করবে না, এমনকি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থাতেও নয়। বাংলাদেশ এমন ভ্যাট বসাবে না, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির প্রতি বৈষম্য হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ সীমান্তে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যছাড়ের প্রক্রিয়া ডিজিটাল করবে।

ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি

চুক্তির এই ধারায় অনুচ্ছেদ রয়েছে চারটি। এতে প্রথমেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন কোনো ডিজিটাল সেবার ওপর কর আরোপ করবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে বৈষম্য সৃষ্টি করে। এ ছাড়া বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্য সহজ করবে। মার্কিন ডিজিটাল পণ্যের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক কোনো নীতি নেবে না। ব্যবসার প্রয়োজনে নিরাপদে সীমান্ত পেরোনো ডেটা আদান-প্রদান নিশ্চিত করবে এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করবে।

বাংলাদেশ যদি অন্য কোনো দেশের সঙ্গে নতুন ডিজিটাল বাণিজ্যচুক্তি করে এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাহলে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করবে। এরপরও যদি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ দূর না হয়, তাহলে তারা বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের এই চুক্তি বাতিল করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিলের নির্বাহী আদেশ ১৪২৫৭ অনুযায়ী আগের পারস্পরিক শুল্কহার আবার চালু করতে পারবে।

বাংলাদেশ ইলেকট্রনিকভাবে পাঠানো কনটেন্ট বা তথ্যের ওপর শুল্ক বসাবে না। অনলাইন লেনদেনে স্থায়ীভাবে শুল্ক না রাখার ডব্লিউটিও প্রস্তাবও সমর্থন করবে।

পরের অনুচ্ছেদের বিষয় বাজারে প্রবেশের শর্ত। এখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ব্যবসার শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে প্রযুক্তি, উৎপাদন পদ্ধতি, সোর্স কোড বা গোপন ব্যবসায়িক তথ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না। নির্দিষ্ট প্রযুক্তি কিনতে বা ব্যবহার করতেও বাধ্য করা যাবে না। তবে সরকারি কেনাকাটা, দুই পক্ষের বাণিজ্যিক চুক্তি, তদন্ত, আইন প্রয়োগ বা আদালতের প্রয়োজনে সোর্স কোড বা অ্যালগরিদম চাওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে তথ্যের গোপনীয়তা রাখতে হবে।

অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা

চুক্তির ৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তার কারণে কোনো বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নিলে বাংলাদেশকে জানাবে। আলোচনার পর বাংলাদেশ নিজের আইন মেনে একই ধরনের সহায়ক ব্যবস্থা নেবে। তৃতীয় দেশের মালিকানাধীন কোনো কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে খুব কম দামে পণ্য রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ক্ষতিগ্রস্ত করলে বাংলাদেশ ব্যবস্থা নেবে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে তথ্য দেবে।

পরের অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও পণ্যের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করবে। এ জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নিয়ম মানবে, নিজের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্য করবে এবং কোনো কোম্পানি যেন এসব নিয়ম ফাঁকি দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করবে।

চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ নিজের আইনের সীমার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন ভঙ্গ করতে পারে—এমন লেনদেন ঠেকানো যায়। আবার বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগের তথ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করবে, যাতে অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে স্বচ্ছতা বাড়ে। বাংলাদেশের এই সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্র তার রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ যাচাই-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে বিবেচনা করবে।

অন্যান্য ব্যবস্থাসংক্রান্ত পরের অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা বাণিজ্য সহজ করতে কাজ করবে। বাংলাদেশ বাজার অর্থনীতির দেশগুলোর জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ চলাচল উৎসাহিত করবে। দুই দেশ শুল্ক ফাঁকি ঠেকাতে সহযোগিতা চুক্তিও করবে। বাংলাদেশ যদি কোনো অ-বাজার অর্থনীতির দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমূলক অর্থনৈতিক চুক্তি করে এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তি দুর্বল হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা করবে। তাতেও উদ্বেগ দূর না হলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাতিল করে আগের পারস্পরিক শুল্ক আবার বসাতে পারবে।

এই অনুচ্ছেদের সবশেষে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনবে না, যাদের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ ঝুঁকিতে পড়ে। তবে বিকল্প সরবরাহকারী না থাকলে বা চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগে বিদ্যমান চুল্লির জন্য চুক্তি হয়ে থাকলে সেসব প্রযুক্তি বা উপকরণ কেনা যাবে।

বাণিজ্যিক বিবেচনা ও সুযোগ

এই ধারায় আছে চারটি অনুচ্ছেদ। বিনিয়োগ–সংক্রান্ত প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি বিনিয়োগ সহজ করবে। মার্কিন বিনিয়োগকারীরা দেশীয় বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের চেয়ে কম সুবিধা পাবেন না। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক (এক্সিম ব্যাংক) ও ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন (ডিএফসি) এসব খাতে অর্থায়ন করতে পারে। বাংলাদেশ এমন নতুন বিনিয়োগেও সহযোগিতা করবে, যা যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান তৈরি করে।

পরের অনুচ্ছেদের বিষয় বাণিজ্যিক বিবেচনা। এখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ত বা রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান পণ্য বা সেবা কেনাবেচায় বাজারভিত্তিক নিয়ম মেনে চলবে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বা সেবার বিরুদ্ধে বৈষম্য করতে পারবে না। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান জনস্বার্থে অ-বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহ ছাড়া দেশীয় উৎপাদকদের ভর্তুকি দিতে পারবে না এবং পণ্য উৎপাদনকারী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সহায়তা বা ভর্তুকি দেওয়া থেকে বিরত থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্র লিখিতভাবে চাইলে বাংলাদেশ ভর্তুকির তথ্য দেবে। কোনো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে কী বিশেষ সহায়তা বা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে, তা জানাতে হবে। তবে জনসেবার জন্য অ-বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এর বাইরে থাকবে। এ ধরনের ভর্তুকি বা সহায়তায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগে অসাম্য তৈরি হলে বাংলাদেশ তা কমাতে পদক্ষেপ নেবে।

পরের অনুচ্ছেদ বস্ত্র ও পোশাক নিয়ে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র এমন ব্যবস্থা করবে, যাতে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্র ও পোশাকপণ্য শূন্য বা কম শুল্কে মার্কিন বাজারে ঢুকতে পারে। তবে সুবিধাটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পর্যন্ত মিলবে। সেই পরিমাণ নির্ভর করবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কতটা তুলা, কৃত্রিম তন্তু বা বস্ত্র উপকরণ আমদানি করছে, তার ওপর।

বাস্তবায়ন, প্রয়োগ ও চূড়ান্ত বিধান

এই ধারার শুরুতেই বলা হয়েছে, সংযুক্তি, পরিশিষ্ট ও ফুটনোট—সবই এই চুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে দুই পক্ষ লিখিতভাবে রাজি হলে চুক্তি বদলানো যাবে, তবে আগের সুবিধা নষ্ট করা যাবে না। এই চুক্তির সুবিধা মূলত বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য। তৃতীয় কোনো দেশ বেশি সুবিধা পেলে দুই পক্ষ আলোচনা করে সুবিধাভোগীদের বিষয়ে আলাদা নিয়ম করতে পারবে।

চুক্তি থাকলেও অন্যায্য বাণিজ্য, হঠাৎ আমদানি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তার কারণে অতিরিক্ত শুল্ক বসানো যাবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে বাংলাদেশ চুক্তি মানেনি, তাহলে আগে আলোচনা করবে। সমাধান না হলে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিলের নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী আগের পারস্পরিক শুল্কহার আবার বসাতে পারবে।

যেকোনো পক্ষ লিখিত নোটিশ দিয়ে চুক্তি বাতিল করতে পারবে। নোটিশের ৬০ দিন পর বা দুই পক্ষের ঠিক করা তারিখে বাতিল কার্যকর হবে। দুই পক্ষ নিজেদের আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা লিখিতভাবে জানালে ৬০ দিন পর চুক্তি চালু হবে। চাইলে তারা অন্য তারিখও ঠিক করতে পারবে।

পরিশিষ্টে যা আছে

প্রথমেই আছে বাংলাদেশের শুল্ক তালিকা। এই অংশে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পণ্যে কী হারে শুল্ক নেবে, তা বলা হয়েছে। এতে কাস্টমস ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রক শুল্ক অন্তর্ভুক্ত আছে। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর বাংলাদেশ নির্ধারিত নিয়মে শুল্ক কমাবে বা নেবে। এ জন্য পাঁচ ধরনের শ্রেণি রাখা হয়েছে। যেমন ইআইএফ শ্রেণিতে চুক্তি চালুর দিন থেকেই শুল্ক শূন্য হবে। বি-৫ শ্রেণিতে প্রথমে অর্ধেক শুল্ক কমবে, বাকি অংশ ধাপে ধাপে কমে পঞ্চম বছরে শূন্য হবে। বি-১০ শ্রেণিতে প্রথমে অর্ধেক কমবে, বাকি অংশ ধাপে ধাপে কমে দশম বছরে শূন্য হবে। এ শ্রেণিতে শুল্ক আগেই শূন্য, তাই তা শূন্যই থাকবে। এক্স শ্রেণিতে কোনো ছাড় নেই, আগের এমএফএন শুল্কহারই বহাল থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক তালিকা অংশে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক তালিকা অনুযায়ী ঠিক হবে, কোন বাংলাদেশি পণ্য ছাড় পাবে। তালিকাভুক্ত কিছু পণ্যে অতিরিক্ত পাল্টা শুল্ক বসবে না। তালিকার বাইরে থাকা বাংলাদেশি পণ্যে সর্বোচ্চ ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বসতে পারে। তবে এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ এমএফএন শুল্ক আলাদাভাবে বহাল থাকবে।

নির্দিষ্ট অঙ্গীকার

এখানে মূলত চুক্তি কার্যকর করতে দুই দেশ কী কী অঙ্গীকার করছে এবং তা কীভাবে পালন করা হবে, তার উল্লেখ রয়েছে। এর প্রথমটি অশুল্ক বাধা ও সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে।

চিকিৎসা যন্ত্র ও ওষুধ আমদানি: বাংলাদেশ চিকিৎসা যন্ত্র ও ওষুধ আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এফডিএর অনুমোদনকে গুরুত্ব দেবে। এফডিএ অনুমোদিত চিকিৎসা যন্ত্র ও ওষুধকে বাজারজাতের যথেষ্ট প্রমাণ হিসেবে ধরা হবে।

কম ঝুঁকির যন্ত্রে এফডিএর আলাদা অনুমোদন না লাগলে বাংলাদেশও নতুন অনুমোদন চাইবে না। এফডিএর ইলেকট্রনিক সনদ গ্রহণ করা হবে; কাগজের আসল, সত্যায়িত বা হাতে সই করা কপি চাওয়া হবে না।

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক চিকিৎসা যন্ত্র নিয়ন্ত্রক ফোরামের নির্দেশনা মেনে নিয়ম করবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অডিট ও সনদ গ্রহণ করবে। একবার অনুমোদিত ওষুধের জন্য বারবার নতুন অনুমোদন লাগবে না, বড় নিরাপত্তা বা মানগত সমস্যা না থাকলে। যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ কারখানা এফডিএর সাম্প্রতিক পরিদর্শনে ঠিক থাকলে বাংলাদেশ সাধারণত সেই রিপোর্ট মেনে নেবে।

মোটরযান ও যন্ত্রাংশ: বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও নির্গমন মান মেনে তৈরি গাড়ি ও যন্ত্রাংশ গ্রহণ করবে। এসব পণ্য আমদানিতে বাড়তি অনুমোদন বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়া চাইবে না। মার্কিন গাড়ি ও যন্ত্রাংশের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক অন্য শর্তও তুলে দেওয়া হবে।

পুনর্নির্মিত পণ্য: বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পুনর্নির্মিত পণ্য ও যন্ত্রাংশের ওপর আমদানি নিষেধাজ্ঞা ও লাইসেন্সের শর্ত তুলে দেবে।

কৃষিপণ্য: বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও কৃষিপণ্যের স্বাস্থ্য, মান ও কারিগরি নিয়মকে গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নেবে। মার্কিন সরকারি সনদও গ্রহণ করবে। সনদে শুধু দরকারি তথ্যই চাওয়া হবে। আর নতুন কোনো খাদ্য বা মান-সংক্রান্ত নিয়ম আনলে বাংলাদেশ আগে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিওকে জানাবে এবং অন্য দেশের মতামতও বিবেচনা করবে।

কারখানা নিবন্ধন ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা: বাংলাদেশ মার্কিন দুগ্ধ, মাংস, পোলট্রি ও ডিমজাত পণ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাগ্রিকালচার-ইউএসডিএ) অধীন সংস্থাগুলোর তদারকি ও সনদ গ্রহণ করবে। দুগ্ধপণ্যের ক্ষেত্রে অ্যাগ্রিকালচারাল মার্কেটিং সার্ভিসের (এএমএস) ডেইরি স্যানিটারি সার্টিফিকেট থাকলে পণ্য আমদানি করা যাবে। আর মাংস, পোলট্রি ও ডিমজাত পণ্যের ক্ষেত্রে ফুড সেফটি অ্যান্ড ইন্সপেকশন সার্ভিসের (এফএসআইএস) তদারকি যথেষ্ট বলে ধরা হবে। এ জন্য বাংলাদেশ আলাদা করে কারখানা বা পণ্য নিবন্ধন চাইবে না। যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের সরকারি তালিকাও বাংলাদেশ গ্রহণ করবে।

এখানে যেসব পণ্যের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো হলো গরু, ভেড়া ও ছাগলের দুধ থেকে তৈরি দুগ্ধপণ্য; মাংস; পোলট্রি; ভুঁড়ি-কলিজাসহ অন্যান্য অভ্যন্তরীণ অঙ্গ; প্রক্রিয়াজাত মাংস ও পোলট্রি; সিলিউরিফর্মিস (ক্যাটফিস) ধরনের মাছ এবং ডিমজাত পণ্য।

কৃষি জৈব প্রযুক্তি: বাংলাদেশ কৃষি জৈব প্রযুক্তিপণ্য নিয়ে এমন নিয়ম চালু রাখবে, যা বিজ্ঞান ও ঝুঁকির ভিত্তিতে হবে। এর লক্ষ্য হলো, এসব পণ্যের অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ ও কার্যকর রাখা, যাতে বাণিজ্য বাড়ে। এই চুক্তি চালু হওয়ার ২৪ মাসের মধ্যে বাংলাদেশ এমন নীতি করবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বিক্রি হওয়া কিছু কৃষি জৈব প্রযুক্তিপণ্য বাংলাদেশেও আনা ও বিক্রি করা যায়। এ জন্য আলাদা করে নতুন বাজার-পূর্ব পরীক্ষা, ডিরেগুলেশন, বাড়তি লেবেলিং বা নতুন অনুমোদন চাইবে না। আর যদি আমদানি করা কৃষিপণ্যে খুব অল্প পরিমাণে এমন জৈবপ্রযুক্তি উপাদান পাওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশ বিষয়টি দ্রুত দেখবে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য দেশের নিরাপত্তা ও ঝুঁকি মূল্যায়নও বিবেচনায় নেবে।

জীবিত নয় এমন পরিবর্তিত জীব: কৃষি জৈব প্রযুক্তি থেকে তৈরি যেসব খাদ্য বা কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে, সেগুলোতে আর জীবিত পরিবর্তিত জীব থাকে না, এসব পণ্যের জন্য আলাদা সরকারি অনুমোদন লাগবে না। এখানে প্রক্রিয়াজাত বলতে বোঝানো হয়েছে—তাপ দেওয়া, গুঁড়া করা বা এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে পণ্যটি আর অঙ্কুরিত হতে না পারে।

উচ্চমাত্রার প্যাথোজেনিক এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা: বার্ড ফ্লু ধরা পড়লে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পুরো অঙ্গরাজ্য থেকে পোলট্রি, ডিম বা সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানি বন্ধ করতে পারবে না। নিষেধাজ্ঞা শুধু আক্রান্ত এলাকার ১০ কিলোমিটার জোনে সীমিত রাখতে হবে।

বাংলাদেশকে ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন ফর অ্যানিমেল হেলথের (ডব্লিউওএএইচ) মান মানতে হবে এবং ইউএসডিএ অ্যানিমেল অ্যান্ড প্ল্যান্ট হেলথ ইন্সপেকশন সার্ভিসকে (এপিএইচআইএস) সেই কর্তৃপক্ষ হিসেবে মানতে হবে, যারা বলবে কোনো এলাকা ইনফ্লুয়েঞ্জা মুক্ত কি না। এপিএইচআইএস কোনো ১০ কিলোমিটার এলাকাকে নিরাপদ বললে, সেখান থেকে পোলট্রি ও পোলট্রিজাত পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানি করা যাবে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত সীমার বাইরে বাড়তি কড়াকড়ি করতে পারবে না।

হালাল সনদ: বাংলাদেশ যদি হালাল সনদ বাধ্যতামূলক করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব সনদদাতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের শর্ত পূরণ করবে, তাদের হালাল সনদ বাংলাদেশকে মেনে নিতে হবে। এ জন্য বাড়তি কোনো আলাদা শর্ত দেওয়া যাবে না।

ম্যাক্সিমাম রেসিডিউ লেভেলস (এমআরএলস): খাদ্যে রাসায়নিক অবশিষ্টের নিরাপদ সর্বোচ্চ সীমা বা এমআরএল বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও ঝুঁকি বিবেচনায় ঠিক করবে। নিজস্ব সীমা না থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সীমা, আর সেটিও না থাকলে কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াসের মান মানবে। কোনো পণ্য এমআরএল না মানলে বাড়তি নজরদারি শুধু দায়ী প্রতিষ্ঠানের ওপর করা যাবে। প্রতিষ্ঠানকে জবাব ও সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে। একই সমস্যা বারবার হলে তবেই প্রতিষ্ঠান স্থগিত করা যাবে।

উদ্ভিদ বা উদ্ভিদজাত পণ্য: যুক্তরাষ্ট্র কোনো উদ্ভিদ বা উদ্ভিদজাত পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানির অনুমতি চাইলে বাংলাদেশ ২৪ মাসের মধ্যে প্রক্রিয়া শেষ করবে। এ জন্য আমদানির নিয়ম নিয়ে দুই দেশ একটি প্রটোকলে একমত হবে। কীটপতঙ্গের ঝুঁকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র চাইলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি মেনে ২৪ মাসের মধ্যে প্রটোকল চূড়ান্ত করবে।

আমদানি লাইসেন্স: বাংলাদেশকে আমদানি লাইসেন্স-সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিতভাবে ডব্লিউটিওতে জানাতে হবে। আর যুক্তরাষ্ট্র থেকে খাদ্য ও কৃষিপণ্য আনার আগে বাংলাদেশ আমদানি অনুমতিপত্র বা এলসি বাধ্যতামূলক করবে না।

মেধাস্বত্ব: জিআই সুরক্ষায় বাংলাদেশকে স্বচ্ছ ও ন্যায্য নিয়ম রাখতে হবে। এতে আপত্তি, পরীক্ষা ও বাতিলের সুযোগ থাকবে। জিআই নামটি আগে থেকে কোনো ট্রেডমার্কের সঙ্গে মেলে কি না বা সেটি সাধারণ নাম কি না, তা দেখতে হবে। জিআইয়ের কোন অংশ সুরক্ষিত, তা স্পষ্ট করতে হবে। সাধারণ নাম হলে আলাদা সুরক্ষা দেওয়া যাবে না। কোনো শব্দ সাধারণ নাম কি না, তা নির্ধারণে অভিধান, সংবাদপত্র, ওয়েবসাইট, বাজারে ব্যবহার, আন্তর্জাতিক মান ও অন্য দেশের ব্যবহার বিবেচনা করতে হবে।

আন্তর্জাতিক চুক্তি: বাংলাদেশ যদি এখনো সদস্য না হয়ে থাকে, তাহলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিচের আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব চুক্তিগুলোতে যোগ দিতে হবে ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এর মধ্যে বার্ন কনভেনশন, মারাকেশ ট্রিটি ও প্যারিস কনভেনশনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। অন্যদিকে বুদাপেস্ট ট্রিটি, হেগ অ্যাগ্রিমেন্ট (জেনেভা অ্যাক্ট), পেটেন্ট কো-অপারেশন ট্রিটি, পেটেন্ট ল ট্রিটি, সিঙ্গাপুর ট্রিটি, ইউপিওভি কনভেনশন, ডব্লিউআইপিও কপিরাইট ট্রিটি এবং ডব্লিউআইপিও পারফরম্যান্সেস অ্যান্ড ফোনোগ্রামস ট্রিটিতে ৫ বছরের মধ্যে যোগ দিতে হবে। আর মাদ্রিদ প্রটোকলে যোগ দেওয়ার সময়সীমা ৩ বছর।

সেবা খাত: চুক্তি কার্যকর হওয়ার ৩ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে ডব্লিউটিওর জয়েন্ট ইনিশিয়েটিভ অন সার্ভিসেস ডোমেস্টিক রেগুলেশনসে যোগ দিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে বিমা খাতে বাধ্যতামূলক রিইনস্যুরেন্স সেশন তুলে দিতে হবে। ফলে মার্কিন বিমা কোম্পানিগুলোকে আর তাদের অন্তত ৫০ শতাংশ ব্যবসা সাধারণ বীমা করপোরেশনকে দিতে হবে না।

বিনিয়োগ: বাংলাদেশ তেল-গ্যাস, বিমা ও টেলিযোগাযোগ খাতে মার্কিন বিনিয়োগের ওপর থাকা বিদেশি মালিকানার সীমা শিথিল করবে। প্রয়োজন অনুযায়ী মার্কিন বিনিয়োগকারীদের এনওসি (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট) দেবে।

বিনিয়োগের অর্থ আনা-নেওয়ার অনুমোদনপ্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে হবে। বিদেশি মুদ্রায় বাজারদরে টাকা পাঠানোর সুযোগও রাখতে হবে। এ ছাড়া মার্কিন কোম্পানিগুলোর বকেয়া পাওনা দ্রুত পরিশোধ করতে হবে এবং এ–সংক্রান্ত আইএমএফ কর্মসূচির প্রতিশ্রুতিও মানতে হবে।

ভালো নিয়ন্ত্রক চর্চা ও স্বচ্ছতা: বাংলাদেশকে আইন-বিধি ও সরকারি সিদ্ধান্ত দ্রুত অনলাইনে প্রকাশ করতে হবে। নতুন নিয়ম করার আগে সবাইকে জানিয়ে মতামত নিতে হবে। নিয়ম তৈরিতে তথ্য-প্রমাণ, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও ঝুঁকি মূল্যায়ন ব্যবহার করতে হবে। আন্তর্জাতিক মান মেনে অপ্রয়োজনীয় বাণিজ্য বাধা কমাতে হবে এবং পুরোনো নিয়ম নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।

দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা: বাংলাদেশকে দুর্নীতি ঠেকাতে শক্ত আইন করতে ও তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। দুর্নীতিতে জড়িতদের শাস্তি, সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণবিধি, স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া এবং স্বাধীন দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে হবে। নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

শ্রম আইন ও অন্যান্য ব্যবস্থা: বাংলাদেশকে শ্রম আইন সংশোধন করে সংগঠন করার স্বাধীনতা ও যৌথ দর-কষাকষির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এর মধ্যে ইউনিয়ন নিবন্ধনের ২০ শতাংশ সদস্যের শর্ত কমানো, ইউনিয়ন বাতিলে শ্রম আদালতের অনুমতি বাধ্যতামূলক করা এবং সদস্যদের ব্যক্তিগত তথ্যের চাহিদা সীমিত রাখার কথা আছে। ইউনিয়ন নিবন্ধনের জন্য একটি সাধারণ সভা, গঠনতন্ত্র গ্রহণ ও কার্যবিবরণী জমা দিলেই চলবে। ইউনিয়নবিরোধী বৈষম্য ও অন্যায্য শ্রমচর্চার জরিমানা বাড়াতে হবে। শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করা অন্যায্য শ্রমচর্চা হিসেবে গণ্য হবে এবং শ্রমিক বা ইউনিয়ন সরাসরি শ্রম আদালতে মামলা করতে পারবে।

ধর্মঘটের অধিকারের ওপর অযৌক্তিক বাধাও কমাতে হবে। যেমন প্রতিষ্ঠান চালুর পর নির্দিষ্ট সময় ধর্মঘট নিষিদ্ধ রাখার বিধান তুলে দেওয়া এবং অবৈধ ধর্মঘটের জন্য জেলসহ কঠোর শাস্তি কমানো।

ইপিজেডে শ্রমিকদের অধিকার: বাংলাদেশকে ইপিজেডে কর্মীদের সংগঠন করার স্বাধীনতা ও যৌথ দর-কষাকষির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার দুই বছরের মধ্যে ইপিজেডগুলোকে বাংলাদেশ শ্রম আইনের আওতায় আনতে হবে, যাতে শ্রমিকেরা ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও তাতে যোগ দিতে পারেন, অথবা ইপিজেড শ্রম আইন এমনভাবে সংস্কার করতে হবে, যাতে স্বাধীন ইউনিয়ন গঠন সম্ভব হয়।

ইপিজেড শ্রম আইনকে বাংলাদেশ শ্রম আইন ও আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। ধর্মঘটের অধিকারে অযৌক্তিক বাধা তুলে দিতে হবে এবং অবৈধ ধর্মঘটের জন্য জেলসহ কঠোর শাস্তি কমাতে হবে।

অন্যান্য ব্যবস্থা: বৈধ ইউনিয়ন কার্যক্রম ও প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার কারণে পোশাকশ্রমিক ও শ্রমিকনেতাদের বিরুদ্ধে থাকা বিচারাধীন ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তি বা প্রত্যাহার করতে হবে। এর মধ্যে ২০২৩ সালের ন্যূনতম মজুরি আন্দোলনের মামলাও থাকবে। চুক্তির তিন বছরের মধ্যে নিয়মিত ন্যূনতম মজুরি পর্যালোচনা ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং এরপর প্রতিবছর তা পর্যালোচনা করতে হবে। শ্রমিক ইউনিয়নের আবেদন ৫৫ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি, অনলাইনে আবেদনের অবস্থা প্রকাশ এবং নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।

শ্রম আইন বাস্তবায়নে বাজেট, পরিদর্শক নিয়োগ ও পদোন্নতি বাড়াতে হবে। পরিদর্শকদের ইপিজেডসহ সব কর্মস্থলে আকস্মিক পরিদর্শন ও ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে। শ্রম, অগ্নি ও ভবন নিরাপত্তা ভাঙলে শাস্তি বাড়াতে হবে এবং শ্রম আইন লঙ্ঘনের তদন্ত দ্রুত শেষ করতে হবে।

পরিবেশ: বাংলাদেশের আইন ও নীতিতে উচ্চমানের পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

অবৈধ কাঠ কাটা ও সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য: বাংলাদেশকে অবৈধ বনজ পণ্যের বাণিজ্য ঠেকাতে হবে এবং এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে। বন খাতে সুশাসন, দুর্নীতিবিরোধী আইন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ও গাছ কাটার অনুমতি অনলাইনে প্রকাশ করতে হবে।

সম্পদ-দক্ষ অর্থনীতি: বাংলাদেশকে সম্পদের অপচয় কমিয়ে দক্ষ অর্থনীতি গড়তে হবে। এ জন্য বাণিজ্য বাধা কমানো, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া এবং ব্যবহৃত পণ্য আবার উৎপাদনচক্রে ফেরানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

মৎস্য ভর্তুকি: বাংলাদেশকে দ্রুত ডব্লিউটিওর মৎস্য ভর্তুকি চুক্তি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। অবৈধ মাছ ধরা, অঘোষিত মাছ ধরা এবং অতিরিক্ত শিকার হওয়া মাছের মজুতে ভর্তুকি বন্ধ করতে হবে।

মৎস্য ভর্তুকি যেন অতিরিক্ত নৌযান, অতিরিক্ত সক্ষমতা বা অতিরিক্ত মাছ ধরা না বাড়ায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। দরকার হলে ভর্তুকি ব্যবস্থাও সংস্কার করতে হবে।

টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনা: বাংলাদেশকে টেকসইভাবে মাছ ধরা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সামুদ্রিক প্রাণী রক্ষা পায়। অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরা ঠেকাতে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ, বন্দরে নজরদারি বাড়ানো এবং অবৈধ মাছ বা মাছজাত পণ্য জাহাজে স্থানান্তর বন্ধ করতে হবে।

অবৈধ বন্য প্রাণী বাণিজ্য দমন: বাংলাদেশকে অবৈধ বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদ বাণিজ্য ঠেকাতে হবে। বন্দরে নজরদারি ও চালান পরীক্ষা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাচার বন্ধ করতে হবে এবং ইচ্ছাকৃত আন্তর্জাতিক পাচারকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।

বিপন্ন বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক সনদ (সাইটিস): বাংলাদেশকে সাইটিস বাস্তবায়ন জোরদার করতে হবে, যাতে তালিকাভুক্ত প্রাণী ও উদ্ভিদের বাণিজ্য আইনসম্মত ও টেকসই হয় এবং খসড়া জাতীয় আইন চূড়ান্ত করে সাইটিস সচিবালয়ে জমা দিতে হবে।

শুল্ক ও বাণিজ্য সহজীকরণ: বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক বিল অব লেডিংকে বৈধ দলিল হিসেবে মানবে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক তথ্য গোপন রাখবে এবং কম ঝুঁকির দ্রুত চালান দ্রুত ছাড় করবে। ইমপোর্ট জেনারেল ম্যানিফেস্ট (আইজিএম) সংশোধনের আবেদন কাস্টমস মূল্যায়ন করবে। বাংলাদেশকে বাণিজ্য ও শুল্ক-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশে ডব্লিউটিওর নিয়ম মানতে হবে। শুল্ক মূল্যায়নের তথ্য ডব্লিউটিওতে দিতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাংস, পোলট্রি, মাছ ও ডিমজাত পণ্যের ইলেকট্রনিক সনদ সরাসরি গ্রহণের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি: বাংলাদেশ ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রেখে সীমান্ত-পেরোনো ডেটা আদান-প্রদানের আন্তর্জাতিক সনদকে স্বীকৃতি দেবে। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন করার সময় যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও ব্যবসায়ীদের মতামত বিবেচনা করবে।

সাইবার সেফটি অধ্যাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা যুক্ত হবে, তবে সাইবার অপরাধের শাস্তি কঠোর করা হবে। ২০২১ সালের ডিজিটাল, সামাজিক মাধ্যম ও ওটিটি বিধিমালা বদলানো বা বাতিল হবে; এনক্রিপটেড সেবায় ব্যবহারকারী শনাক্ত ও এনক্রিপশন কি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হবে। এ ছাড়া ৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের একটি অংশ লাইসেন্স ছাড়া ওয়াই-ফাই ধরনের প্রযুক্তির জন্য খুলে দেওয়া হবে এবং এ-সংক্রান্ত যন্ত্রের অনুমোদন দ্রুত চালু করা হবে।

অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা: বাংলাদেশ বন্দর, পণ্য পরিবহন নজরদারি ও বাণিজ্যিক জাহাজে নিরাপদ ডিজিটাল ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে, যাতে সাইবার ঝুঁকি, তথ্য ফাঁস ও বিদেশি সরকারের অননুমোদিত প্রবেশ ঠেকানো যায়।

যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি বা যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত সংবেদনশীল পণ্য অনুমতি ছাড়া রপ্তানি, পুনঃরপ্তানি বা দেশের ভেতরে হস্তান্তর করা যাবে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশ কাস্টমস ও লেনদেনের তথ্য যাচাই করবে, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তথ্য বিনিময় করবে।

বাংলাদেশ নিজস্ব রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। এতে তদন্ত, নিরীক্ষা এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি শাস্তির বিধান থাকবে। যেসব দেশকে জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি মনে করবে, সংবেদনশীল প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার সরবরাহ ব্যবস্থায় তাদের ভূমিকা সীমিত রাখবে বাংলাদেশ।

যুগান্তর

দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘বাড়তি সুবিধার প্রস্তাব’। প্রতিবেদনে বলা হয়, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার কারণ দেখিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সরকারি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন বেশ কয়েকজন জেলা প্রশাসক (ডিসি)। তাদের যুক্তি-মূল্যবৃদ্ধি ও বিভিন্ন খরচে জীবনযাত্রা ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় রেশন সুবিধা, বিনামূল্যে সরকারিভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষাসহ বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তুলে ধরে তা সমাধানেরও প্রস্তাব করেছেন। ভোজ্যতেলের সংকট কাটাতে রাইস ব্র্যান তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ, ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলারের লাইসেন্সের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন, সড়কের ভাঙাচোরা মেরামতসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রস্তাব করেছেন তারা। রোববার শুরু হওয়া চার দিনের ডিসি সম্মেলনে তারা এসব প্রস্তাব দিয়েছেন।

সম্মেলনে রেশন দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন পিরোজপুরের ডিসি। এ কর্মকর্তার যুক্তি-মূল্যবৃদ্ধি ও বিভিন্ন খরচে জীবনযাত্রা ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। এতে ধারদেনা ও ঋণে মানসিক চাপ বাড়ছে। ফলে দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটছে। রেশন চালু হলে চাপ কমবে, জীবনযাত্রা সহজ হবে বলে তিনি মত দেন। বলেন, এতে মনোযোগ বাড়বে সরকারি দায়িত্বে। তিনি ১২ থেকে ২০তম গ্রেডে চাকুরেদের জন্য এ প্রস্তাব দিয়েছেন। কারণ, এসব গ্রেডেই সবচেয়ে বেশি কর্মচারী। ২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত ‘স্ট্যাটিসটিকস অব পাবলিক সার্ভেন্ট-২০২৪’ অনুযায়ী সাড়ে ১৪ লাখ কর্মচারীর মধ্যে এই আট গ্রেডেই আছে ১০ লাখ ৩৫ হাজার।

রোববার পূর্বনির্ধারিত সময় ও কর্মসূচি অনুসারে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ডিসি সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসনবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারীসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবরা। সভায় সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। এছাড়া বিভাগীয় কমিশনার এবং ডিসিরা উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে মোট তিনজন বিভাগীয় কমিশনার এবং নয়জন ডিসি বক্তৃতা করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি কর্মচারীদের ২০টি বেতন গ্রেড রয়েছে। এক নম্বর গ্রেডে সচিব, দুই নম্বরে অতিরিক্ত সচিব, তিনে যুগ্ম এবং চার নম্বর গ্রেডে উপসচিব। তারাই ডিসি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। রেশন সুবিধার প্রস্তাব এসেছে বান্দরবান ও রাঙামাটির ডিসিদের কাছ থেকেও। তাদের মত, রেশন সুবিধা দিলে কাজের আগ্রহ ও সেবার মান বাড়বে।

উল্লেখ্য, রেশনের দাবি জানাতে গিয়ে জেল খেটেছেন সচিবালয়ের কর্মচারীদের নেতা বাদিউল কবীরসহ ১৪ জন কর্মচারী এবং এ সংক্রান্ত মামলা এখনো চলমান। তাছাড়া ১০ বছর তাদের বেতন বাড়েনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কমিশন গঠন করে বেতন কাঠামোর সুপারিশ তৈরি এবং তা পাশও করে গেছেন। কিন্তু নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। জিনিসপত্রের দাম অত্যধিক বাড়ায় জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে বলে ডিসি সম্মেলনের বক্তব্যে উঠে এসেছে। চর এলাকার জীবনযাপন কতটা কঠিন, তা উঠে আসে কুড়িগ্রামের ডিসির প্রস্তাবে। তার মতে, চর এলাকায় জীবনযাপন অত্যন্ত কঠিন ও অতিরিক্ত ব্যয়বহুল। ভৌগোলিক অবস্থান ও ঝুঁকিতে সেখানে অবস্থান করতে নিরুৎসাহিত হন সরকারি কর্মচারীরা। কুড়িগ্রামের ডিসি এজন্য চর-ভাতা চালুর কথা বলেন। ডিসিরা ভাতা পেলে সেখানে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি সেবার মানও বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি জানান।

কর্মচারীদের জন্য ফ্রি স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রস্তাব করেছেন কুমিল্লার ডিসি। তার যুক্তি, মেডিকেল ভাতা হিসাবে তারা যা পান, তা অপ্রতুল। তিনি সরকারি দপ্তরের অনিয়মিত শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর কথাও বলেন। এছাড়া দপ্তরের অনিয়মিত গাড়িচালকদের কম বেতনের কথাও উঠে আসে সম্মেলনের বক্তব্যে। বলা হয়, ভূমি অফিসের অনিয়মিত গাড়িচালকরা মাসে পান ১৫ হাজার ৪০০ টাকা। অতিরিক্ত বেতন না থাকায় ছুটির দিনে দায়িত্ব পালনে অনীহা থাকে তাদের। চরে কর্মরত শিক্ষক, স্বাস্থ্যসেবাকর্মী ও অন্য চাকুরেদের সমস্যা তুলে ধরেছেন কেউ কেউ। নিত্যপণ্যের বাজারের উত্তাপের কথাও ডিসি সম্মেলনে উঠছে নানা দিক থেকে।

ডিসিদের প্রস্তাবগুলো সাজানো হয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ভিত্তিক। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের খাতে ফুটে উঠেছে স্বাস্থ্যের দুরবস্থা। তেমনই রয়েছে শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, খাদ্য, বাসস্থানসহ বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক প্রস্তাব। সেসব প্রস্তাবে শুধু যে সরকারি চাকুরেদের বিষয়ই এসেছে, তা নয়। সাধারণের বিষয় বিবেচনা করেই বেশির ভাগ প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।

কালের কণ্ঠ

‘পৈশাচিক জিম্মি কাহিনি’-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা থেকে অপহরণের পর প্রথমে বাহারছড়ার নির্জন জঙ্গলে জিম্মি করা হয়, এরপর তাদের তুলে দেওয়া হয় মাছধরা ট্রলারে। সেখানে আবার যোগ হয় মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রলোভনের টানে ছুটে আসা নারী-পুরুষ। এভাবে ২৬০ জনকে জড়ো করে শুরু হয় একটি ট্রলারের ভয়ংকর সমুদ্রযাত্রা। চার পৈশাচিক জিম্মি কাহিনিদিন পর মাঝসমুদ্রে প্রতারকচক্রের পৈশাচিক আচরণের এক পর্যায়ে জিম্মিদের সঙ্গে শুরু হয় হট্টগোল-মারামারি।

টালমাটাল ট্রলারটি আন্দামান সাগরে ডুবে করুণ পরিণতি ঘটে জিম্মিচক্রের ২৬৪ নারী-পুরুষের। গভীর সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে একসময় নাটকীয়ভাবে উদ্ধার পায় ৯ জন।

লোমহর্ষক এই অপহরণ-প্রলোভন ও জিম্মি-মুক্তিপণ কারবারের আদ্যোপান্ত অনুসন্ধানের পর জানা যায়—কক্সবাজারকেন্দ্রিক ভয়ংকর এক প্রতারকচক্র এখন সক্রিয় নিরীহ রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি নারী-পুরুষের জীবন নিয়ে জুয়াখেলায়।

এক পলকে শুরু ও শেষ

৪ এপ্রিল ২০২৬, রাত সাড়ে ৮টা। কক্সবাজারের বাহারছড়া থেকে একটু দূরের সমুদ্র। ৪২ ফুট দৈর্ঘ্য, ১৫ ফুট প্রস্থ আর ১২ ফুট উচ্চতার একটি মাছধরা ট্রলার ধীরে ধীরে চলতে শুরু করে। কিন্তু ট্রলারে কোনো মাছ নেই, নেই কোনো পণ্য। ভেতরের বরফঘর আর ওপরে প্রতি ইঞ্চি জায়গাজুড়ে ভাঁজে আর মানুষ। নারী, শিশু, তরুণ, যুবক। সংখ্যায় প্রায় পৌনে তিন শ। গন্তব্য মালয়েশিয়া। চার দিন সাগরে ভাসার পর ৭ এপ্রিল রাত শেষে ভোর। সূর্য তখনো ওঠেনি।

ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রলারজুড়ে নেমে আসে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। প্রথমে হট্টগোল-মারামারি, এরপর হুড়াহুড়িতে অতিরিক্ত বোঝাই ট্রলারটি একদিকে কাত হয়ে যায়। শুরু হয় আর্তচিৎকার। জনা বিশেষ নারী, ছয় শিশুসহ শত শত মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ছটফট করতে থাকে। নিমেষেই ডুবে যায় ট্রলারটি। নিচের অন্ধকার কুঠরিতে আটকে পড়া বহু মানুষ বেরই হতে পারেনি। ট্রলারসহ তারা উধাও হয়ে যায় আন্দামান সাগরের অতলে।

যারা ওপরে ছিল কিংবা কোনোমতে বের হতে পেরেছিল, তাদের শুরু হয় গহিন সাগরের নোনাজলের সঙ্গে জীবন-মরণ যুদ্ধ। কেউ ড্রাম ধরে ভাসছে, কেউ কাঠের টুকরা, জালের ফ্লোট কিংবা ভাসমান কোনো বস্তু আঁকড়ে ধরে। তীব্র স্রোতের সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই চলতে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

৩৬ ঘণ্টা পর ৯ এপ্রিল সকালে ইন্দোনেশিয়াগামী একটি বাংলাদেশি জাহাজ যাচ্ছিল সেই পথ ধরে। ডেকের এক ক্রু দেখলেন সমুদ্রে কেউ যেন ভাসছে। কেউ যেন হাত নেড়ে ইশারায় বাঁচার আকুতি জানাচ্ছে। মুহূর্তেই খবর পৌঁছে যায় জাহাজের ক্যাপ্টেনের কাছে। শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। প্রায় তিন ঘণ্টার অভিযানে উদ্ধার করা যায় মাত্র ৯ জনকে। আশপাশে কয়েক নটিক্যাল মাইল ঘুরে দুরবিন দিয়ে খুঁজেও আর কারো দেখা মেলেনি।

এরপর কেটে গেছে ২৫ দিন। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো আর ফেরেনি। তাদের অপেক্ষায় দিন গুনছেন স্বজনরা। কোথাও মা, কোথাও বা স্ত্রী ঘরের দুয়ার খুলে বসে আছেন পথ চেয়ে, এই বুঝি প্রিয় মানুষটি ফিরে এলো! এই বুঝি ফোনটা বেজে উঠল! আন্দামান সাগরে তলিয়ে যাওয়া এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির ক্ষত এখন কক্সবাজারের নানা প্রান্তে।

শতাধিক পরিবার, ফিরে আসা তিন ভুক্তভোগী, উদ্ধারকারী জাহাজের ক্যাপ্টেন এবং কারাবন্দি অভিযুক্ত মাঝির সঙ্গে কথা বলে, অনুসন্ধান করে পাওয়া গেছে এই ভয়াবহ অপহরণ ও মানবপাচার-ট্র্যাজেডির পূর্ণ চিত্র।

গত মাসের প্রথম সপ্তাহে কক্সবাজার থেকে মালয়েশিয়াগামী এই ট্রলারডুবির ঘটনায় হতবাক বিভিন্ন মহল। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ট্রলারটিতে আড়াই শর বেশি মানুষ ছিল। তাদের মধ্যে শতাধিক বাংলাদেশি এবং বাকিরা কক্সবাজারে আশ্রিত রোহিঙ্গা।

এ ঘটনার নেপথ্যের কাহিনি জানতে শুরু হয় কালের কণ্ঠের অনুসন্ধান। ঢাকা থেকে ছুটে যাই কক্সবাজারের টেকনাফে। শাহপরীর দ্বীপ, দক্ষিণপাড়া, উত্তরপাড়া, উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প, অপহরণ ও মানবপাচারের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট সরেজমিনে দেখার পর আমরা চলে যাই কক্সবাজার জেলা কারাগারে। মানবপাচারের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারের কথা শুনতে যাই পেকুয়া, রামু, বাঁশখালী; এমনকি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়েও। শুধু তাই নয়, সাগরপথে মানবপাচারের ভয়াবহতার তালাশ চলে সুদূর মালয়েশিয়ায় সরেজমিনে গিয়ে।

প্রায় তিন সপ্তাহের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অপহরণ ও প্রলোভনের মাধ্যমে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের ভয়াবহ জিম্মি কাহিনি বেরিয়ে আসে। অপহরণ করে মালয়েশিয়ায় বিক্রি করে দেওয়ার তথ্য যেমন আছে, আবার মুক্তিপণের জন্য দেশে-বিদেশে জিম্মি করে রাখার মতো ভয়াবহ ঘটনার সন্ধানও পাওয়া গেছে অনুসন্ধানে।

সমকাল

দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘ছোট ঋণে খেলাপির ৬৮ শতাংশ ১০ ব্যাংকে’। খবরে বলা হয়, কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) শিল্প খাতে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭২ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকার ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪৯ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা, যা এ খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৬৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। অথচ ব্যাংক খাতের মোট সিএমএসএমই ঋণের ৩৮ শতাংশের কম রয়েছে এসব ব্যাংকে। এই ব্যাংকগুলোর উচ্চ খেলাপির প্রভাবে পুরো ব্যাংক খাতে ছোট ঋণের খেলাপির হার অনেক বেড়েছে। মোট ঋণে এসএমইর অংশ বাড়িয়ে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার। কিন্তু তা না বেড়ে আরও কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

জাতীয় এসএমই নীতির আলোকে ২০২৯ সালের মধ্যে মোট ঋণের ২৭ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এ ক্ষেত্রে ২০২৫ সাল নাগাদ ঋণের অন্তত ২৫ শতাংশ এ খাতে দেওয়ার কথা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ বাড়ানোর প্রধান উদ্দেশ্য হলো কর্মসংস্থান বাড়ানো। উন্নয়নশীল দেশগুলো সব সময়ই এ ধরনের খাতে বেশি জোর দিয়ে থাকে। বর্তমান সরকার প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য ঠিক করেছে। এ জন্য বন্ধ কারখানা সচল করার জন্য বিশেষ তহবিল গঠনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মোট ঋণে সিএমএসএমইর অংশ কমছে

মোট ঋণে সিএমএসএমই খাতের অংশ না বেড়ে ধারাবাহিকভাবে কমছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ১৭ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সিএমএসএমই খাতে দেওয়া হয়েছে তিন লাখ এক হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের মাত্র ১৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। গত জুন পর্যন্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মোট ১৮ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা ঋণের মধ্যে সিএমএসএমই খাতে ছিল ৩ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। ওই সময় পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের যা ১৭ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ঋণের ১৮ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং ২০২৩ সাল পর্যন্ত মোট ঋণের ১৯ দশমিক ১১ শতাংশ ছিল এ খাতে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসএমই ঋণ বাড়াতে নানা নির্দেশনা দিয়ে আসছে। তবে ব্যাংকগুলো কম কষ্টে বেশি মুনাফা করার আশায় সব সময়ই করপোরেট ঋণে বেশি আগ্রহ দেখায়। কিন্তু বড় ঋণ দিয়ে অনেক ব্যাংক ঝামেলায় পড়েছে। তা আদায় না হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ব্যাংকের কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

তারা জানান, সিএমএসএমই খাতে উৎসাহিত করতে গত ডিসেম্বরে কুটির, ক্ষুদ্র ও ছোট ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখার শর্ত শিথিল করা হয়। এ জাতীয় সাধারণ ঋণ ও দুই মাস পর্যন্ত বকেয়া ঋণে (এসএমএ) বিপরীতে দশমিক ৫০ শতাংশ হারে প্রভিশন রাখতে হচ্ছে। এর আগে এটি সাধারণ ঋণে ১ ও এসএমএতে ৫ শতাংশ ছিল। এ ছাড়া বিনা জামানতে নারীদের জন্য ২৫ লাখ টাকা এবং অন্য ক্ষেত্রে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আবার করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) নেই এমন ব্যবসায়ীরা যে কোনো ব্যবসা-সংক্রান্ত সনদ দিয়ে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারছেন। এরপরও ব্যাংকগুলো সিএমএসএমই ঋণের চেয়ে করপোরেট খাতে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহ দেখায়।

গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতের মোট ঋণের মধ্যে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এর মানে মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ খেলাপি। মূলত বড় করপোরেট গ্রুপের প্রভাবে ব্যাংক খাতের খেলাপি এ পর্যায়ে উঠেছে। ১০টি ব্যাংকের উচ্চ খেলাপির পরও ব্যাংক খাতের মোট খেলাপির তুলনায় সিএমএসএমই খাতে খেলাপির হার অনেক কম। অনেক ভালো ব্যাংকের এসএমইতে খেলাপি ঋণ খুব সামান্য। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দেশের শীর্ষ এসএমই ব্যাংক ব্র্যাকের এ খাতে মোট ঋণ রয়েছে ৩০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে খেলাপি ঋণ মাত্র ৬৬৯ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের মাত্র ২ দশমিক ১৯ শতাংশ।

খেলাপি ঋণে শীর্ষ ১০ ব্যাংক

গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সিএমএসএমই খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের মধ্যে ৭২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বা ২৪ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে ৬৮ দশমিক ৩০ শতাংশ রয়েছে শীর্ষ ১০ ব্যাংকে। সিএমএসএমই ঋণের পরিমাণে বিবেচনায় খেলাপি সবচেয়ে বেশি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে। এ খাতে ব্যাংকটির ২৯ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে ৯ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

বেসিক ব্যাংকের ৮ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে খেলাপি ৬ হাজার ১৬৯ কোটি টাকা। জনতা ব্যাংকের ১১ হাজার ৪২ কোটি টাকা এসএমই ঋণের বিপরীতে ৫ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে। এ খাতে সোনালী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা ঋণের ৪ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা খেলাপি।
পরিমাণ বিবেচনায় সিএমএসএমই খাতে খেলাপি ঋণে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির ৫ হাজার ১০৭ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৪ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

এর পরের অবস্থানে থাকা আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা সিএমএসএমই ঋণের তিন হাজার ৮৯১ কোটি টাকা খেলাপি। এ ছাড়া এসআইবিএলের ৪ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা ঋণের ৩ হাজার ২৪২ কোটি টাকা।

পদ্মা ব্যাংকের তিন হাজার ৩৭১ কোটি টাকার মধ্যে তিন হাজার ২১৪ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে। আর এ খাতে এক্সিম ব্যাংকের ৫ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা ঋণের ৩ হাজার ৫৮ কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

ইত্তেফাক

‘হাওরে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট’-এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওর জুড়ে হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এ যেন হঠাত্ করেই কৃষকের মাথায় ‘আকাশ ভেঙে পড়েছে’। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ইতিমধ্যে অনেক ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু নেত্রকোনাতেই প্রায় ১১ হাজার হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে। এই জেলায় ধান কাটা হয়েছে মাত্র এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি। আবার যেটুকু কাটা হয়েছে, মিলছে না ন্যায্য দাম। একই চিত্র হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ থেকে পটুয়াখালী পর্যন্ত। মাঠে তলিয়ে যাওয়া ধান আর উঠানে শুকাতে না পারা ভেজা শস্য, দুই সংকটের চাপে কৃষকের সামনে এখন একটাই প্রশ্ন: এই ক্ষতি পুষিয়ে বছর চলবে কীভাবে?

গতকাল রবিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘হাওর অঞ্চলে চলমান বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ফসলহানি, দুর্যোগ পরিস্থিতি এবং হাওরবাসীর দাবি’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেছেন, হাওরের ফসলহানি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে। তবে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নে সতর্ক থাকতে হবে। এটি যেন পক্ষপাতদুষ্ট না হয়।

আমাদের নেত্রকোনা প্রতিনিধি ও খালিয়াজুরি সংবাদদাতা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত নেত্রকোনা ও খালিয়াজুরিতে হাওরে ১১ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। এই পরিমাণ জমির ধান নষ্ট হবার আশঙ্কা রয়েছে। হাওরসহ সারা জেলায় আক্রান্ত জমির পরিমাণ হচ্ছে ১৮,৪৭৮ হেক্টর। এ কারণে অনেক কৃষকের স্বপ্ন ভেঙে খান খান। যতটুকু ধান পাওয়া গেছে, সেই ধানের দামও পাচ্ছে না কৃষক। এখন প্রতিমণ ধান বিক্রয় হচ্ছে মাত্র ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম জানান, যদি আর কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হয়, তা হলে হাওরের বাকি ধান এক সপ্তাহের মধ্যেই কাটা শেষ হবে।

তিনি বলেন, জমিতে পানি জমে থাকায় হারভেস্টার মেশিন ধান কাটতে পারছে না। ধান কাটা শ্রমিকরাই কাঁচি দিয়ে ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন। যেখানেই সুযোগ পাচ্ছেন, সেখানেই কৃষকরা ভিজা ধান শুকানোর জন্য ছুটছেন। হাওর এলাকার কৃষক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, পানির নিচে পাকা ও আধাপাকা ধান আছে তা কাটানোর জন্য শ্রমিকদের প্রতি কাঠায় ১ হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে হয়। এছাড়াও ধান কাটার পড়ে তা নৌকা দিয়ে বাড়ি আনার জন্য আরো ১ হাজার টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা খরচ হচ্ছে। এতে করে প্রতি ১ কাটা জমির ধান কারতে ২ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। ঋণ করে ধান চাষ করা কৃষকের একমাত্র ফসল হারিয়ে এখন এত টাকা খরচ করে ধান কাটার টাকা তাদের হাতে নেই।

নয়া দিগন্ত

দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘অভিবাসন ব্যয়ে নিঃস্ব বিদেশগামীরা’। খবরে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষ কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। কিন্তু এই যাত্রা অনেকের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে পরিণত হচ্ছে দুঃস্বপ্নে। অভিযোগ রয়েছে, সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের কয়েকগুণ বেশি অর্থ খরচ করে বিদেশে যেতে হচ্ছে বেশির ভাগ শ্রমিককে। ফলে বিদেশে গিয়ে কঠোর পরিশ্রম করেও অনেকে ২ থেকে ৩ বছর সময় নিচ্ছেন শুধু নিজের বিনিয়োগ করা পুঁজি ফেরত তুলতে। এর মধ্যে আবার অনেকেই নানা প্রতারণা ও জটিলতায় পড়ে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, বিদেশগামী শ্রমিকদের বড় একটি অংশ দালালচক্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে বিদেশে যাচ্ছেন। বিদেশে যাওয়ার পরও তাদের অনেকেই পড়ছেন আকামা বা ভিসা জটিলতা, নবায়ন সমস্যা, চুক্তি অনুযায়ী কাজ ও বেতন না পাওয়া, এমনকি আইনি ঝামেলার মতো নানা সঙ্কটে। এসব জটিলতা সামাল দিতে না পেরে অনেক শ্রমিক ‘কারণে-অকারণে’ স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়ে কারাগারেও যাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব ক্ষেত্রে প্রবাসী বাংলাদেশীদের অনেকেই প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাচ্ছেন না দূতাবাস থেকে, ফলে তাদের কারাগারের ভেতরে মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত (দুবাই), জর্ডান ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ইউরোপের ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমানো কর্মীদের বড় অংশই অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের শিকার হচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অতিরিক্ত ব্যয়ের পেছনে বড় কারণ হচ্ছে সিন্ডিকেট এবং দালালনির্ভর নিয়োগ প্রক্রিয়া।

অভিবাসন খাতের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা জানান, বিদেশে কর্মী পাঠাতে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সরাসরি সুযোগ সীমিত। ফলে দালালদের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপাচ্ছে শ্রমিকদের ওপর। এই পরিস্থিতিতে বিদেশে গিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেও অনেকে তাদের বিনিয়োগের টাকা তুলতে পারছেন না, যা তাদের মধ্যে হতাশা বাড়াচ্ছে।

ভুক্তভোগী শ্রমিক ও অভিবাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিবেশী দেশ নেপাল, শ্রীলঙ্কা কিংবা ফিলিপাইন থেকে যে খরচে একজন কর্মী বিদেশে যেতে পারেন, একই দেশে যেতে বাংলাদেশী শ্রমিকদের কয়েকগুণ বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। এ বৈষম্য নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও কার্যকর সমাধান দেখা যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, সিন্ডিকেটমুক্ত এবং স্বল্প ব্যয়ে কর্মী পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে যেসব শ্রমিক বিদেশে যাচ্ছেন, তাদের প্রকৃত ব্যয় কত হচ্ছে তা কঠোরভাবে মনিটরিং করা প্রয়োজন। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত খরচের চেয়ে বহু গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করেও শ্রমিকরা বিদেশে যাচ্ছেন।

বণিক বার্তা

‘দেশের আমদানি-রফতানি দুই খাতেই মন্দা’-এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) দেশের পণ্য রফতানি ২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ কমেছে।

এ খাতের সবচেয়ে বড় পণ্য তৈরি পোশাকের রফতানি কমেছে ২ দশমিক ৮২ শতাংশ। রফতানির শীর্ষ পাঁচের অন্যতম কৃষিজ পণ্যের কমেছে ৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ।

রফতানির পাশাপাশি আমদানিতেও মন্দা ভাব বিরাজ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) খোলা কমেছে দশমিক ১৯ শতাংশ। মূলধনি যন্ত্রপাতির এলসি খোলা কমেছে ৩ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ, শিল্প কাঁচামালের ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র খোলা কমেছে ১০ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, আমদানি ও রফতানি উভয় খাতেই নিম্নমুখী প্রবণতা বিরাজ করছে, যা দেশের অর্থনীতির গতি মন্থর হওয়ার ইঙ্গিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, ইপিবির তথ্য অনুযায়ী ১০ মাসে মোট পণ্য রফতানি কমে যাওয়াটা শুধু একটি সংখ্যাগত পতন নয়; এটি দেশের অর্থনীতিতে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের প্রতিফলন। বৈশ্বিক মন্দা ভাব, বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে চাহিদা হ্রাস প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাককে সরাসরি প্রভাবিত করেছে। পাশাপাশি জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ডলারের বাজারে অস্থিরতা উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছে। ফলে দেশের রফতানিমুখী শিল্পগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে আমদানি ও রফতানি উভয় ক্ষেত্রেই নিম্নমুখিতা নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সংকেত। আমদানির নিম্নমুখী প্রবণতায় দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ও রফতানি সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’

তিনি এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় রফতানি বাজার বহুমুখীকরণ, উৎপাদন খরচ কমানো এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন।

শিল্পের কাঁচামাল, ভোগ্যপণ্য ও মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি হ্রাস উদ্যোক্তাদের উৎপাদন সম্প্রসারণে অনীহা, নতুন বিনিয়োগে ধীরগতি এবং ভোক্তা চাহিদায় নিম্নগতিকে নির্দেশ করে—এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের। বিশেষভাবে মূলধনি যন্ত্রপাতির ঋণপত্র খোলা কমে যাওয়া ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের গতি মন্থর হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র হ্রাস পাওয়া রফতানিনির্ভর শিল্পে অর্ডার কমে যাওয়ার একটি পরোক্ষ সূচক।

দেশের শিল্প খাত কয়েক বছর ধরেই চাপে রয়েছে বলে মনে করেন শিল্পোদ্যোক্তারা। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ সুদের হার এবং লজিস্টিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় চাপে আছে শিল্প খাত। এছাড়া সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন কমে যাওয়ায় স্টিল ও সিমেন্টের মতো নির্মাণসামগ্রীর চাহিদাও হ্রাস পেয়েছে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন বড় গ্রোথ বা প্রবৃদ্ধির দরকার নেই। বিদ্যমান শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরগুলো অন্তত যাতে টিকে থাকতে পারে, সরকারকে এখন সে ধরনের একটি এনভায়রনমেন্ট ক্রিয়েট (পরিবেশ তৈরি) করে দেয়ার দিকেই বেশি নজর দিতে হবে।’

তবে এপ্রিলের একক পরিসংখ্যানে আশার আলো দেখছে ইপিবি। চলতি বছরের এপ্রিলে ৪০০ কোটি ৯৯ লাখ ৩০ হাজার ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি। ইপিবির দাবি, টানা আট মাসের নেতিবাচক ধারা ভেঙে রফতানি খাতে এক অভাবনীয় প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। সংস্থাটি মনে করে, প্রতিকূলতা কাটিয়ে শিল্প খাতের স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রসারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি পুনরায় শক্তিশালী অবস্থানে ফিরছে।

গতকাল হালনাগাদ পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যায় শক্তিশালী এ পুনরুদ্ধার বিশ্ববাজারে পণ্যের পুনঃচাহিদা বৃদ্ধি এবং দেশের রফতানি শিল্পের সক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ জানিয়ে ইপিবি বলেছে, প্রবৃদ্ধির এ ঊর্ধ্বমুখী ধারা মাসভিত্তিক হিসাবেও পরিলক্ষিত হয়েছে; মার্চের ৩৪৮ কোটি ৭ লাখ ২০ হাজার ডলারের তুলনায় এপ্রিলে রফতানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ২০ শতাংশ। এ ধারাবাহিক উন্নতি টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং বাণিজ্য পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইপিবির প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে মোট রফতানি হয়েছে ৩ হাজার ৯৩৯ কোটি ৬৪ লাখ ৪০ হাজার ডলারের পণ্য, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের ৪ হাজার ২০ কোটি ৮১ লাখ ৬০ হাজার ডলারের তুলনায় ২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশের সামান্য কম। তবে সম্প্রতি এপ্রিলের উল্লম্ফন একটি ইতিবাচক মোড় নির্দেশ করছে, যা আগামী মাসগুলোতে আগের ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার শক্তিশালী সম্ভাবনা তৈরি করেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

আজকের পত্রিকা

দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘প্রথম অধিবেশন পর্যালোচনা: সহযোগিতা-বিরোধিতার মিলমিশের সংসদ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক উত্থান-পতনের পর গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হলো চার দিন আগে। ২৫ কার্যদিবসের এই অধিবেশনে দেশের ইতিহাস, রাষ্ট্রীয় সংস্কারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তুমুল বিতর্ক দেখল দেশবাসী। এসব ইস্যুতে সরকারি দল ও বিরোধী দল একে অপরকে ছেড়ে কথা বলেনি। আবার জ্বালানিসংকটের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যখন আলোচনায় এল, তখন সহযোগিতার হাত বাড়াতে দেখা গেল উভয় পক্ষকে। সব মিলিয়ে সংসদের প্রথম অধিবেশনকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সংসদবিষয়ক গবেষক নিজাম উদ্দিন আহমদ গতকাল রোববার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘অধিকাংশ সংসদ সদস্য নতুন হওয়ার পরও মোটের ওপর তাঁদের কর্মকাণ্ড ভালো। তাঁরা শিখছেন। বিশেষ করে সরকারি ও বিরোধী দলের সমঝোতার কিছু জিনিস দেখা যাচ্ছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারি ও বিরোধী দল তর্ক-বিতর্ক করবে। আবার বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতায় আসবে। এটা ভালো লক্ষণ।’

গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে। স্পিকারের অনুপস্থিতিতে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে অধিবেশনের শুরুতে স্পিকার পদে হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ডেপুটি স্পিকার পদে কায়সার কামাল নির্বাচিত হন। সংবিধান অনুযায়ী প্রথম দিন ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। অধিবেশন শেষ হয় গত ৩০ এপ্রিল।

এই অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই জাতীয় সনদ, সংবিধান সংস্কার পরিষদ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা বিল পাসসহ নানা বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে যুক্তিতর্ক হয়েছে। যদিও আইন প্রণয়ন, প্রতিনিধিত্ব এবং তদারকির বিষয়গুলো আশানুরূপ নয় বলে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ক্ষেত্রে অধিকাংশ সদস্যের অনভিজ্ঞতাকে মোটাদাগে দায়ী করছেন তাঁরা।

অধিবেশনের প্রথম দিনই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করতে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়; যার মধ্যে ৯৮টি হুবহু, ১৫টি সংশোধনী আকারে এবং ৪টি রহিতকরণের জন্য সংসদে বিল পাসের জন্য উত্থাপনের সুপারিশ করে। বাকি ১৬টি অধ্যাদেশ ল্যাপস করার সুপারিশ করে কমিটি। শেষ পর্যন্ত ৯১টি বিলের মাধ্যমে ১১৭টি অধ্যাদেশের সমাধান করা হয়; যার মধ্যে ৯৭টি অধ্যাদেশ হুবহু, ১৩টি সংশোধনীসহ এবং সাতটি রহিত করা হয়। এ ছাড়া বর্তমান সরকারের সময়ে সংশোধিত তিনটি বিল পাস হয়। এর মধ্যে সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা বাতিল করে করে ‘দ্য মেম্বারস অব পার্লামেন্ট (রেমুনারেশন অ্যান্ড অ্যালাউন্সেস) অর্ডার, ১৯৭৩ সংশোধন বিল’ পাস হয় আলোচনা ছাড়া।

সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর প্রায় ৪০ ঘণ্টার আলোচনায় অংশ নিয়েছেন ২৮০ জন সংসদ সদস্য।

নিকট অতীতে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের সঙ্গে যে সম্পর্ক দেখা যেত, এবার তার কিছুটা ব্যতিক্রম দেখছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, সেখানে সহযোগিতা এবং সংঘাতময় সম্পর্ক সামনে এসেছে। জ্বালানিসংকট নিয়ে আলোচনার পর দুই পক্ষের সমন্বয়ে কমিটি গঠনকে সহযোগিতার প্রকাশ বলে মনে হয়েছে। তবে কতগুলো বিষয়ে মতানৈক্য দেখা গেছে। এর মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে দুই পক্ষ যেন ভিন্ন মেরুতে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এই সংসদে ৩০০ জনের ২৯৮ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন; যাঁদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানসহ ২২০ জনই প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

দেশ রূপান্তর

‘সরকারি কোম্পানির মেরুদণ্ডে কোপ!’-এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, আয়বৈষম্য সৃষ্টি করে সরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার বেসরকারি এবং যৌথ উদ্যোগে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে আয়বৈষম্য সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু করে। বর্তমান সরকার সেই ধারাবাহিকতায় সরকারি কোম্পানিগুলোকে চুক্তি করার জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ সক্ষমতা হারাবে। ফলে বিদ্যুৎ খাতের নিয়ন্ত্রণ এককভাবে বেসরকারি কোম্পানির হাতে চলে যাবে। এতে সরকার বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে বাধ্য হবে।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকার বরাবর ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এর আগে চিনি, পাট, বস্ত্র, কাগজকল ধ্বংসের মতো ঘটনা ঘটেছে। সঠিক নীতি ও পরিচালনার ব্যর্থতার কারণে এই চার খাতে সরকারি অংশীদারত্ব লোকসান করেছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য খাতে ঠিক এর বিপরীত চিত্র ছিল সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানিগুলোতে। প্রতিটি কোম্পানিই প্রতি বছর মুনাফা করেছে। এতে সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়নি। নিজস্ব বিনিয়োগ সক্ষমতা সৃষ্টি হওয়ায় দাতাগোষ্ঠী এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কোম্পানিগুলো নতুন নতুন কেন্দ্র নির্মাণ করেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেনার দায়ে ডুবতে বসা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) নতুন কেন্দ্র নির্মাণের জন্য বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ঋণ পেতে ব্যর্থ হয়। তখন বিশ্বব্যাংকসহ দাতাদের পরামর্শে বিদ্যুৎ খাত সংস্কারের উদ্যোগ হিসেবে সরকারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কোম্পানি গঠন করা হয়। এতে নতুন নতুন কেন্দ্র গড়ে তোলে সরকারি কোম্পানিগুলো। এসব কোম্পানির শতভাগ শেয়ারের মালিকানাও সরকারের হাতে রয়েছে।

দেখা যায়, সরকারি সব কোম্পানিই বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে টেক্কা দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবসা পরিচালনায় সরকারি কোম্পানিগুলো বেসরকারি কোম্পানির চেয়েও ভালো করছে। সরকারি কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে চীনের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএমসি), নর্থ ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (নরিনকো) এবং সিঙ্গাপুরভিত্তিক সেম্বকর্প ইন্ডাস্ট্রিজ দেশে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে।

ডেইলি স্টার

দ্য ডেইলি স্টারের প্রধান শিরোনাম ‘Interim govt’s missteps behind measles crisis’ অর্থাৎ ‘হাম সংকটের পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারের গাফেলতি’।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের অদক্ষতা ও উদাসীনতার কারণে সৃষ্ট হাম প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত ২৯৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে হামের উপসর্গসহ হামে মৃতের সংখ্যা বাড়ছেই। গতকাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ৬১ জেলায় নিশ্চিত ও উপসর্গে মৃত্যু মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৫ হাজার ছাড়িয়েছে।

একসময় দরিদ্র দেশগুলোর জন্য আদর্শ হিসেবে স্বীকৃত সফল টিকাদান কর্মসূচির অব্যবস্থাপনার জন্য মূলত মুহাম্মদ ইউনূস-নেতৃত্বাধীন সরকারের ব্যর্থতাকেই দায়ী করা হচ্ছে। ১৮ মাস দায়িত্বে থাকা এ সরকার টিকা সংগ্রহের পদ্ধতি ও অর্থায়নের উৎস পরিবর্তনের চেষ্টা করে, যার ফলে ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ঘটে। এতে টিকার সংকট তৈরি হয়ে শেষ পর্যন্ত মজুদ ফুরিয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অসন্তুষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলন ও মাঝে মাঝে কর্মবিরতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা