September 6, 2026, 7:54 am

হরমুজ প্রণালি বন্ধ, কমেছে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি

বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় গত আগস্টে অঞ্চলটি থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি ৩৯ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়েছে।

তেলবাহী জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ট্যাংকারট্র্যাকার্সের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়েছিল। কিন্তু আগস্টে এই রপ্তানি আগের তুলনায় ৩৯ শতাংশ কমে যায়।

প্রতিষ্ঠানটি জানায়, চলতি বছরের মে মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানিতে সবচেয়ে বড় পতন দেখা যায়। সে সময় যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় রপ্তানি ৬৭ শতাংশ কমে গিয়েছিল। মে মাসে দৈনিক তেল রপ্তানির ঘাটতি ছিল প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ ব্যারেল। আগস্টে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭২ লাখ ব্যারেলে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় কয়েক দশকের মধ্যে সমুদ্রপথে অন্যতম বড় পণ্য পরিবহন সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ ব্যবস্থায়।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নতুন করে সামরিক সংঘাত এবং রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের হামলার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ আরও ব্যাহত হয়েছে। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর প্রভাবে গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

গত শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৬ দশমিক ২৮ ডলারে স্থির হয়, যা আগের দিনের তুলনায় ৭৬ সেন্ট বা ০ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ১৮ সেন্ট বা ০ দশমিক ২০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯১ দশমিক ৪৮ ডলারে দাঁড়ায়।

সপ্তাহের হিসাবে ব্রেন্টের দাম বেড়েছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। আর ডব্লিউটিআইয়ের দাম বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোতে চলাচল এখনো স্বাভাবিক না হওয়ায় এই মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি জ্বালানির ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়ছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও ধীর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা।

রিস্ট্যাড এনার্জির প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্লদিও গালিমবার্তির মতে, অর্থনীতির প্রায় সব খাতই ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি বন্ডের সুদের হারও বেশি রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ সংকটের প্রভাব ডিজেলের বাজারেও পড়েছে। এএএ-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে এক গ্যালন ডিজেলের গড় খুচরা মূল্য ৫ দশমিক ৮৫ ডলারে উঠেছে, যা রেকর্ড উচ্চতা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের মজুত দ্রুত কমে যাওয়া এবং কৃষিপ্রধান অঙ্গরাজ্যগুলোতে ফসল কাটা ও বীজ বপনের মৌসুম শুরু হওয়ায় দাম আরও বাড়তে পারে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির প্রধান জ্বালানি ডিজেল হওয়ায় এ সময় চাহিদাও বাড়ে। পাশাপাশি শীত মৌসুম সামনে থাকায় হিটিং অয়েলের দামও দ্রুত বাড়ছে।

এ পরিস্থিতিতে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দামের পূর্বাভাস বাড়িয়েছে সিটি গ্রুপ। আগে ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলার ধরা হলেও নতুন পূর্বাভাসে তা ৮৬ ডলার করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক হতে আগের ধারণার চেয়ে বেশি সময় লাগছে।

অন্যদিকে, এএনজেডের বিশ্লেষকেরাও স্বল্পমেয়াদে ব্রেন্টের দাম নিয়ে পূর্বাভাস বাড়িয়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৫ ডলার করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও তীব্র হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তারা।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা