August 25, 2026, 7:24 am

দেশে দৈনিক গড় হত্যার শিকার ১০ জন, জনমনে শঙ্কা

সম্প্রতি রংপুরের একটি বাসায় শিক্ষক পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে, এই শঙ্কা শুধুমাত্র একটিই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে ঘিরে হয়েছে তা কিন্তু নয়। গত কয়েক মাস ধরে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে এমন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেই চলেছে।
বাংলাদেশের পুলিশ হেডকোয়ার্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত মে থেকে জুলাই পর্যন্ত এই তিন মাসেই সারাদেশে ৯৩৪টি খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে। অর্থাৎ তিন মাসে গড়ে ৩০০র বেশি খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে। সেই হিসেবে দৈনিক খুনের ঘটনা ঘটেছে ১০টিরও বেশি।
বাংলাদেশের পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, চুরি ডাকাতির পরিমাণ আগের চেয়ে কিছুটা কমলেও খুন বা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।
বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতি মাসে কমবেশি ৩০০’র মতো খুনের ঘটনা ঘটছে। গড়ে প্রতিদিন ১০টা করে খুন যেন আমাদের ভাগ্যে লেখা রয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ২ হাজার ৭৬টি। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭, ফেব্রুয়ারি ২৫০, মার্চে ৩১৭ ও এপ্রিলে ২৮৮টি।
তবে পুলিশ এটিও বলেছে, যেসব হত্যাকাণ্ডের যে ঘটনাগুলো ঘটছে তার পেছনে যারা জড়িত তাদেরকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা তারা করছেন এবং অপরাধীদেরও গ্রেফতার করার চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশ আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, বছরের প্রথম সাত মাসে মব সহিংসতায় মারা গেছে ১৩৪ জন। একই সময় রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছে অন্তত ৭৭ জন।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতার আধিপত্য, রাজনৈতিক সংঘাত, মাদক এবং পারিবারিক কলহ বা বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে সবচেয়ে বেশি।
এসব অপরাধ দমনে বর্তমান সরকার ও ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
সাত মাসে খুনের মামলা ২০৭৬টি
প্রতি মাসে খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, চুরি-ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঘটনায় মামলা নিয়ে মাসিক রিপোর্ট প্রস্তুত করে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর।
পুলিশ সদর দপ্তরের এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বছরের প্রথম সাত মাসে খুন বা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে ২০৭৬টি।
এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০, মার্চ মাসে ৩১৭, এপ্রিলে ২৮৮, মে মাসে ৩১০, জুন মাসে ৩২৬ এবং জুলাই মাসে ২৯৮টি। মাস শেষ না হওয়া এখনো পর্যন্ত অগাস্ট মাসের রিপোর্ট যুক্ত হয়নি পুলিশ সদর দপ্তরের রিপোর্টে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের তথ্য মতে, দেশে বৈধ এবং অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতাসহ নানা কারণে খুন ও অপরাধ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না।
অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, ‘এখন অনেকের হাতে হাতে অস্ত্র চলে গেছে। অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান বাড়ছে। রাজনৈতিক দ্বন্দ, পারিবারিক বিবাদ কিংবা ক্ষমতার আধিপত্যের কারণে খুন ও সহিংসতা বাড়ছে’।
শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটে। বিভিন্ন পুলিশি থানা থেকে অস্ত্র লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আস্তে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
তবে, পুলিশ ও বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের চেয়ে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রথম ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন কোন উন্নতি হয়নি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেয় বিএনপি সরকার। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ে সারা দেশে খুনের ঘটনায় এক হাজার ৭৮৯টি মামলা হয়েছে। আগের ছয় মাসে হয়েছিল এক হাজার ৭৮০টি। সে হিসাবে খুনের মামলা বেড়েছে ৯টি।
অন্যদিকে, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় গত ছয় মাসে মামলা হয়েছে ১১ হাজার ১৬৫টি। আগের ছয় মাসে হয়েছিল ১০ হাজার ৯০টি। এই শ্রেণিতে মামলা বেড়েছে ১ হাজার ৭৫টি।
পুলিশের অতিরিক্ত আইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দস্যুতা, ডাকাতি কিংবা চুরির ঘটনা কমলেও খুনের ঘটনা হয়তো খুব একটা কমেনি। মানুষের মধ্যে স্থানীয় বিবাদ, অস্থিরতা এটা অনেকক্ষেত্রে আগে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। আমরা আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি’।
রাজনৈতিক কোন্দল ও হত্যাকাণ্ড
গতকাল রোববার অর্থাৎ ২৩শে অগাস্ট রাতে কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌরসভার সাবেক কাউন্সিল ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগ নেতা আল আমিনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিএনপি, জামায়াত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী কিংবা এনসিপির মধ্যে সংঘাত সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত জুলাই মাস পর্যন্ত সারাদেশে ৪০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব সহিংসতায় ২৯৭৪ জন আহত হয়েছেন এবং মারা গেছে অন্তত ৭৭ জন।
এর মধ্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সহিংসতায় চারজন, জামায়াত বিএনপির সহিংসতায় ৯ জন আর বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত হয়েছে ১৬জন।
বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে যতগুলো কারণ রয়েছে তার মধ্যে রাজনৈতিক কারণ অন্যতম। সারাদেশে যে ৭৭ জন রাজনৈতিক সহিংসতায় মারা গেছে তাদের মধ্যে দুর্বৃত্তদের হামলা ও গুলিতে নিহত হয়েছেন অন্তত ৪০ জন।
মানবাধিকার কর্মী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন এলিনা খান বলেন, ‘আমরা দেখছি নির্বাচিত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার পরিমাণ বাড়ছে। পদ-পদবির জন্য মারামারি হচ্ছে। এই দায় তো সরকারকেই নিতে হবে’।
যদিও পুলিশ মনে করে, রাজনৈতিক কোন্দল আগেও ছিল এখনো রয়েছে। চাইলেই রাজনৈতিক সংঘাত সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না।
অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাগুলো আগে থেকেই ঘটে আসছে। তবে একটা আশার ব্যাপার হলো সরকার থেকে আমাদের ওপর কোন ধরনের চাপ নেই। পুলিশ নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারছে’।
কেন নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না?
চলতি বছরের ঢাকার মিরপুরে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনাটি দেশজুড়ে নানা আলোড়ন তৈরি করে।
সরকারের প্রধানমন্ত্রী পরিবারের সাথে দেখা করতে যায়। দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেন। ওই ঘটনায় জড়িতদের আটকও করে পুলিশ। ঘটনার মাত্র ১৯দিনের মাথায় মামলার রায়ও দেয় ঢাকার নিম্ন আদালত।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, রামিসা শুধু একটি ঘটনা নয়। প্রতিনিয়ত সারাদেশে এমন নারী ও শিশুর প্রতি নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু সব ঘটনায় এত দ্রুত বিচার করা যাচ্ছে না।
অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এখনও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আর আগের মতো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এই সুযোগে খুন, সহিংসতা ও নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড বাড়ছে।
কিন্তু এই অপরাধ দমনে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
অধ্যাপক উমর ফারুক বলেন, ‘যেভাবে খুন সহিংসতার মতো অপরাধগুলো বাড়ছে তা দমনে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এজন্য সরকারের বিশেষায়িত অভিযান পরিচালনা করা দরকার। ২০২৪ সালের অগাস্টের পর পুলিশের অনেকেই ডিমোরালাইজ হয়ে গেছে। অনেকেই ভীতি নিয়ে কাজ করছে’।
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দেশে মব সহিংসতার ঘটনা নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। কিন্তু বর্তমানে মবের মতো ঘটনাগুলো এখনো দমন করা যায়নি কেন সেই প্রশ্নও তুলছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের রিপোর্ট বলছে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে মব সহিংসতায় নিহত হয়েছে ১৩৪ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিহত হয়েছে ঢাকায় ৫০ জন। আর চট্টগ্রামে নিহত হয়েছে ৩১ জন।
মানবাধিকারকর্মী এলিনা খান বলেন, এটা একটা নির্বাচিত সরকার। মানুষ চায় নিরাপত্তা। যে কোন মূল্যে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এটির নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে।
যদিও অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, আগে যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিলো সেটি থেকে পরিস্থিতির একটু উন্নতি হয়েছে।
BCC বাংলা :

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা