হাকিকুল ইসলাম খোকন :
প্রগ্রেসিভ ফোরাম ইউএসএ-এর উদ্যোগে গত শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬,, নিউইয়র্কের কুইন্সের জ্যাকসন হাইটসের জুইস সেন্টারে “সাম্প্রতিক বিশ্ব ভাবনা ও সমসাময়িক বাংলাদেশ”শীর্ষক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।খবর আইবিএননিউজ । সংগঠনের সভাপতি হাফিজুল হকের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বাচ্চুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডা.শাহীন রহমান ।সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ছাএ ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি আনোয়ারুল হক ।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন কালে ডা. শাহীন রহমান পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, সাংস্কৃতিক আধিপত্য CulturalHegemony), বৈচিত্র্য এবং সমাজে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও মৌলবাদের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও মৌলবাদ সমাজ, রাষ্ট্র এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে মানবিক সম্প্রীতি, মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও শান্তিকে বিনষ্ট করে। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পুঁজিবাদ নিজস্ব স্বার্থ ও টিকে থাকার প্রয়োজনে এসব সমস্যার কার্যকর সমাধানে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে এসব সংঘাত ও বিভাজন থেকে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে।
তিনি বলেন, বর্তমানে বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন, গণতান্ত্রিক উত্তরণ, মানবিক সমাজ নির্মাণের প্রচেষ্টা এবং শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে বর্ণবাদ, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, বিচ্ছিন্নতাবাদ, ফ্যাসিবাদ ও নানা ধরনের সংঘাত ক্রমেই প্রবল হয়ে উঠছে। তাঁর মতে, সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী ব্যবস্থা অতীতের ধারাবাহিকতা বহন করলেও বর্তমান সময়ে তা নতুন এক স্তরে উন্নীত হয়েছে।
তিনি পুঁজিবাদের বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন তুলে ধরেন এবংআলোচনা করেন, কীভাবে সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ জনমতকে প্রভাবিত করে বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা পালন করতে পারে। সেই সঙ্গে তিনি বলেন, পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থাকে নিরাপদ রাখতে নানা ধরনের ধ্যান-ধারণা, মতাদর্শ, তত্ত্ব ও জ্ঞানের উৎপাদন এবংবিস্তার ঘটানো হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, এভাবেই গড়ে উঠছে “বিশ্বতত্ত্ব কারখানা (GTI)”, যার অন্যতম কেন্দ্র যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ এবং সেখানকার একাডেমিক পরিমণ্ডল। তাঁর মতে, এসব তত্ত্বের অনেকগুলোই সংগ্রামের মাঠে নয়,বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশে বিকশিত হয়েছে।
ডা. শাহীন রহমান আরও বলেন, ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে নিপীড়ন ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মানুষের সম্মিলিত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। তাঁর মতে, ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ অর্জন সম্ভব হয়েছে সংগঠিত গণআন্দোলনের মাধ্যমে, যেখানে ব্যক্তি স্বার্থের পরিবর্তে সমাজ, জাতি ওজনগণের বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও পর্যবেক্ষণ করেন যে, সমসাময়িক পুঁজিবাদী সমাজে মানুষ ক্রমশ ব্যক্তিগত সাফল্য ও আত্মোন্নয়নের দিকেইবেশি মনোযোগী হয়ে উঠছে। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পুঁজিবাদ ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে উৎসাহিত ও পুরস্কৃত করে, যার ফলে মানুষের মনোযোগ ব্যক্তিগত অর্জনের দিকে কেন্দ্রীভূত হয় এবংবৃহত্তর সামাজিক, জাতীয় ও বৈশ্বিক সংগ্রামে অংশগ্রহণের আগ্রহ কমে যায়। তিনি মনে করেন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক এই প্রবণতা সম্মিলিত আন্দোলন ও সমাজভিত্তিক উদ্যোগকে দুর্বল করে দিতে পারে।
বিশেষ অতিথি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও সাবেক ছাত্রনেতা আনোয়ারুল হক আলোচ্য বিষয়গুলোর ওপর তাঁর মূল্যবান মতামত তুলে ধরেন।
সেমিনারের শেষ পর্বে প্রাণবন্ত প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশগ্রহণকারীরা বিশ্বরাজনীতি, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং সমসাময়িক সামাজিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জনসচেতনতা, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং সম্মিলিত সামাজিক দায়বদ্ধতার গুরুত্ব নিয়ে মতবিনিময় করেন। উপস্থিত বক্তা ও অংশগ্রহণকারীরা মত প্রকাশ করেন যে, সমতা, মানবিক মূল্যবোধ, গণতন্ত্র এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমাজের সকল স্তরের মানুষের সক্রিয় ও সম্মিলিত অংশগ্রহণ অপরিহার্য।সেমিনার শেষে সবাইকে চা চক্রে আপ্যায়ন করা হয় ।