July 1, 2026, 4:02 pm

রক্ত আসতে গিয়ে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে সাংবাদিক-পত্নী

নিজস্ব প্রতিবেদক :
মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র (নিটোর) এ চিকিৎসাধীন সিনিয়র সাংবাদিক জেমস আব্দুর রহিম রানার নির্ধারিত অস্ত্রোপচারের জন্য রক্ত সংগ্রহ করতে গিয়ে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েছেন তার স্ত্রী মোছাঃ রাশিদা সুলতানা। এ ঘটনায় চিকিৎসার জন্য সংরক্ষিত নগদ ৩৮ হাজার ৭০০ টাকা, একটি মোবাইল ফোন, একটি ভ্যানিটি ব্যাগ এবং নিজের কষ্টার্জিত অর্থে তৈরি এক জোড়া স্বর্ণের কানের দুল খোয়া গেছে। ঘটনার পর মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তদন্তে নেমে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। একই সঙ্গে তদন্তে নতুন কিছু প্রশ্ন সামনে আসায় রক্তের সন্ধানে পাঠানো ব্যক্তিদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে সাংবাদিক জেমস আব্দুর রহিম রানা নিটোর হাসপাতালে ভর্তি হন। হাসপাতালে ভর্তির দিনই সাংবাদিক পরিচয়দানকারী এক ব্যক্তি তার এক সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে আসেন এবং রানার পরিবারের সঙ্গে পরিচিত হন। পরবর্তীতে তারা বিভিন্নভাবে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে থাকেন।
গত ২০ জুন সকালে সাংবাদিক রানার নির্ধারিত অস্ত্রোপচারের জন্য জরুরি রক্তের প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু হাসপাতালের রক্ত ব্যাংকে মিলযুক্ত রক্ত পাওয়া যাচ্ছিল না। এ সময় সাংবাদিক পরিচয়দানকারী ওই ব্যক্তি রাশিদা সুলতানাকে দ্রুত শ্যামলীর রূপায়ণ টাওয়ারে অবস্থিত একটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকে যাওয়ার পরামর্শ দেন। পরিবারের দাবি, প্রথমে ফোনে জানানো হয়েছিল প্রসেসিং ফি বাবদ ৫০০ টাকা দিলেই এক ব্যাগ রক্ত পাওয়া যাবে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তার স্বার্থে সাংবাদিক জেমস আব্দুর রহিম রানা তার স্ত্রীকে ওই সাংবাদিক এবং তার সঙ্গে থাকা সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে যেতে বলেন। তবে তারা দুজনই বিভিন্ন ব্যস্ততার কথা বলে সঙ্গে যেতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখান থেকে চলে যান।
পরবর্তীতে রাশিদা সুলতানা একাই রূপায়ণ টাওয়ারে যান। সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে জানানো হয় রক্তের মূল্য ৩ হাজার টাকা। পরে পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে আসার কথা উল্লেখ করে ২ হাজার টাকায় রক্ত দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় এবং ওই অর্থ পরিশোধে সম্মত না হওয়ায় তিনি রক্ত সংগ্রহ না করেই হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, রূপায়ণ টাওয়ার থেকে ফিরে আসার পথে শ্যামলী শিশু মেলা সংলগ্ন ওভারব্রিজ এলাকায় দুই অজ্ঞাত ব্যক্তি তার সঙ্গে কথোপকথন শুরু করে। তারা প্রথমে বিভিন্ন তথ্য জানতে চায় এবং পরে তার স্বামীর জন্য রক্তের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেয়। সরল বিশ্বাসে তাদের কথায় সাড়া দিলে তারা তাকে ওভারব্রিজের পশ্চিম পাশে নিয়ে যায়। সেখানে বিভিন্ন কৌশল ও প্রতারণামূলক কথাবার্তার মাধ্যমে তাকে অচেতন করে ফেলা হয়।
প্রায় আধা ঘণ্টা পর জ্ঞান ফিরে পেয়ে তিনি দেখতে পান, তার কাছে থাকা একটি মোবাইল ফোন, একটি ভ্যানিটি ব্যাগ, চিকিৎসার জন্য সংরক্ষিত নগদ ৩৮ হাজার ৭০০ টাকা এবং তার কানে থাকা সাড়ে চার আনা ওজনের এক জোড়া স্বর্ণের কানের দুল নেই। পরিবারের দাবি, স্বর্ণের কানের দুলটি রাশিদা সুলতানা নিজের কষ্টার্জিত অর্থে তৈরি করেছিলেন এবং সেটির সঙ্গে তার ব্যক্তিগত আবেগ ও স্মৃতি জড়িত ছিল।
ঘটনার পরপরই তিনি হাসপাতালে ফিরে বিষয়টি তার স্বামীকে জানান। সে সময় জেমস আব্দুর রহিম রানা অপারেশন থিয়েটারের সামনে অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় ছিলেন। পরে বিষয়টি মোহাম্মদপুর থানাকে অবহিত করা হলে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে অনুসন্ধান শুরু করে এবং লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগ পাওয়ার পর মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে। ফুটেজে দেখা কয়েকজন ব্যক্তির গতিবিধি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে এবং তাদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে পুলিশের হাতে থাকা স্থিরচিত্রে দেখা এক ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তে জনসাধারণের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
এদিকে তদন্তে নতুন মোড় সৃষ্টি হয়েছে রক্তের সন্ধানে পাঠানো ব্যক্তিদের ভূমিকা ঘিরে। পরিবারের অভিযোগ, রূপায়ণ টাওয়ারে যাওয়ার জন্য যেসব সাংবাদিক পরিচয়দানকারী ব্যক্তি ও তার সহযোগী পরামর্শ দিয়েছিলেন, ঘটনার পর থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একাধিকবার ফোন করেও তাদের পাওয়া যায়নি।
পরিবারের দাবি, ঘটনার প্রায় ১২ দিন পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একজনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ হলে তিনি জানান, ঢাকায় সাংবাদিক জেমস আব্দুর রহিম রানার পরিচিত একজন ব্যক্তি তাকে রানার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে তিনি ওই ব্যক্তির নাম-পরিচয় প্রকাশ করেননি।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই বক্তব্যের পর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কে বা কারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে এমন পরামর্শ দিয়েছিলেন, কেন যোগাযোগ বন্ধ রাখা হয়েছিল এবং ঘটনার সঙ্গে এর কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘটনার আগে ও পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা, ফোন যোগাযোগ, অবস্থান এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্যও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
তবে তদন্তের স্বার্থে পুলিশ এখনো কাউকে অভিযুক্ত বা সন্দেহভাজন হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করেনি। সংশ্লিষ্ট সকল তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।
মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের পক্ষ থেকে জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা ব্যক্তিকে কেউ চিনে থাকলে অথবা তার সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা থাকলে দ্রুত থানার সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য। তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখা হবে বলেও জানানো হয়েছে।
রাজধানীতে অজ্ঞান পার্টি ও প্রতারক চক্রের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে হাসপাতাল, বাস টার্মিনাল, বাজার ও জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষকে টার্গেট করে সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের অপরাধ দমনে আরও কঠোর নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।
গুরুতর আহত সাংবাদিক জেমস আব্দুর রহিম রানা ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতার এবং খোয়া যাওয়া নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য মালামাল উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা