মোহাম্মদ আসাদ-স্টাফ রিপোর্টার ।
আসন্ন বকশীগঞ্জ উপজেলার নিলক্ষিয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীদের মধ্যে নানা সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত চেয়ারম্যান পদে চারজন প্রার্থীর নাম আলোচনায় রয়েছে। তারা হলেন—সাবেক ইউপি সদস্য ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম লিচু, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মমতাজুর রহমান মমতাজ, মিয়া বাড়ির কন্যা মেহজাবিন বিনতে অরিণ এবং জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী মাওলানা কারিমুল ইসলাম।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চারজন প্রার্থীই ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নিয়ে নির্বাচনী মাঠে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে ভোটাররা প্রার্থীদের অতীত কর্মকাণ্ড, বর্তমান অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা যাচাই-বাছাই করেই সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন।
নজরুল ইসলাম লিচু দীর্ঘ ১৮ বছরেরও বেশি সময় নিলক্ষিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি তিনি প্যানেল চেয়ারম্যান ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন। এলাকায় ক্লিন ইমেজের জনপ্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত লিচু এবার তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী মাঠে নেমেছেন। ২০২৪ সালে নিলক্ষিয়া ইউনিয়ন পরিষদের উপ-নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছিল। সে সময়ও নজরুল ইসলাম লিচু চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন স্থগিত হয়। পারিবারিকভাবে সচ্ছল হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে তিনি গরিব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতা করে আসছেন। দীর্ঘ ১৮ বছর জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তার বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়নি। ইউনিয়নজুড়ে তার ব্যাপক সুনাম রয়েছে। গত উপ-নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণাতেও চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিলেন। এসব কারণে তিনি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী বলে জানিয়েছেন তার সমর্থকরা।
অন্যদিকে চেয়ারম্যান প্রার্থী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মমতাজুর রহমান মমতাজ দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তিনি এলাকার সাধারণ মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনে সহায়তা করে আসছেন বলে জানা গেছে। দলীয় নেতাকর্মীদের বিপদে-আপদেও আর্থিক সহায়তা করে থাকেন তিনি।
এ ছাড়া তার সহোদর বড় ভাই মিজানুর রহমান এলাকায় ক্লিন ইমেজের সমাজসেবক হিসেবে পরিচিত। ধারণা করা হচ্ছে, ভাইয়ের পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা নির্বাচনী মাঠে মমতাজকে বাড়তি সুবিধা এনে দিতে পারে। পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ তার পাশে থাকবে বলেও আলোচনা রয়েছে। তাছাড়া বিএনপি ক্ষমতায় থাকার ফলে অতিরিক্ত সুযোগ তার ঝুলিতে যাবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
মেহজাবিন বিনতে হাসিব অরিণ ঐতিহ্যবাহী মিয়া বাড়ির কন্যা হওয়ায় ইউনিয়নজুড়ে তার ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। সেই পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে তিনি নির্বাচনী মাঠে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন।
গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৩ হাজার ৯৯ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন। গত নির্বাচনের ভোট এবং পারিবারিক ঐতিহ্যকে সামনে রেখে পিছিয়ে পড়া নারীদের এগিয়ে নিতে বিভিন্ন কর্মসূচি ও প্রচারণার মাধ্যমে মাঠে কাজ করছেন তিনি।
এ ছাড়া তিনি বিভিন্নভাবে ইউনিয়নের গরিব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বেশ সুনাম ও আস্থা অর্জন করেছেন। তার শক্তিশালী নারী কর্মীবাহিনীও রয়েছে।
জামায়াত সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে হাফেজ মাওলানা কারিমুল ইসলামকে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরছেন দলটির নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিলক্ষিয়া ইউনিয়নে জামায়াতের এমপি প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ৬ হাজার ৩৫৬ ভোট পেয়েছিলেন। অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী ধানের শীষ প্রতীকে ৬ হাজার ৩৯৬ ভোট পেয়ে প্রায় সমানতালে লড়াই করেছিলেন।
যদিও এবার স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকবে না, তারপরও জাতীয় নির্বাচনের ভোটের হিসাব জামায়াত সমর্থকদের মাঝে আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। জামায়াত নেতাকর্মীদের ধারণা, জাতীয় নির্বাচনে যারা দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়েছেন, তারা স্থানীয় নির্বাচনেও জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষেই থাকবেন। দলীয় নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে কাজ করছেন এবং জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আত্মবিশ্বাসী বলে জানিয়েছেন।
যদিও প্রার্থীরা ও তাদের সমর্থকরা নানা কৌশলে নির্বাচনী প্রচার-প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে ভোটারদের হিসাব-নিকাশ ভিন্ন। ভোটাররা প্রার্থীদের অতীত কর্মকাণ্ড, বর্তমান অবস্থান এবং ইউনিয়নের উন্নয়নে তাদের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক। কারণ, এবার নিলক্ষিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের কোনো হেভিওয়েট চেয়ারম্যান প্রার্থী না থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। নিলক্ষিয়া ইউনিয়নেই সাবেক এমপি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানের বাড়ি। তারা দুজনেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং তাদের জনপ্রিয়তা এখনও শক্ত অবস্থানে রয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগের ভোটাররা যাকে সমর্থন দেবেন, নির্বাচনে সেই প্রার্থী এগিয়ে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
যদিও এখনো নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়নি, তবুও নিলক্ষিয়া ইউনিয়নে নির্বাচনকে ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা এবং সম্ভাব্য সমীকরণ ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। ভোটের মাঠে শেষ পর্যন্ত কারা জোট বাঁধবে এবং কোন ভোটব্যাংক কার দিকে যাবে, সেটিই এখন ইউনিয়নবাসীর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।